ঝুলন্ত পাহাড়ি ঝরনা আর কলকল শব্দে বয়ে চলা ছড়াগুলো একসময় সীতাকুণ্ডের প্রাণ ও প্রকৃতিকে জীবন্ত করে রাখত। কিন্তু আজ পাহাড়ের কোলঘেঁষা সেই চিরচেনা খাল ও ছড়াগুলো দখল, দূষণ আর অপরিকল্পিত অবকাঠামোর নিচে পিষ্ট হয়ে মৃতপ্রায়। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হওয়ায় বর্ষায় জলাবদ্ধতা আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে তীব্র পানির হাহাকার। প্রকৃতির এই করুণ পরিণতি রুখে দিয়ে পাহাড়ি পানির স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে আনতে খাল ও ছড়া পুনরুদ্ধারের দাবি এখন এ অঞ্চলের মানুষের বাঁচা-মরার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
উপজেলার চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশ, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা ও বাঁশবাড়িয়া এলাকার বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ছড়া ও খালগুলো আজ বেদখল হয়ে গেছে। কোথাও গড়ে উঠেছে অবৈধ পাকা স্থাপনা, আবার কোথাও ছড়ার মুখ বন্ধ করে ফেলা হয়েছে ড্রেন বা ময়লার ভাগাড়ে। প্রভাবশালী মহলের আগ্রাসনে পানি নিষ্কাশনের এই প্রাকৃতিক পথগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড়ি ঢলের পানি লোকালয়ে ঢুকে প্লাবিত করছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি। অন্যদিকে মাটির ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুকিয়ে যাচ্ছে চারপাশের হাজারো কূপে ও নলকূপের পানি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হিসেবে পরিচিত এই জনপদে পানির এমন হাহাকার এবং খালের করুণ দশা স্থানীয়দের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পাহাড়ের পানি স্বাভাবিকভাবে সাগরে বা জলাশয়ে যাওয়ার পথগুলো বন্ধ থাকায় ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি কৃষিকাজ ও মৎস্যসম্পদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সময়মতো এই খাল ও ছড়াগুলো পুনরুদ্ধার না করা হলে আগামী দিনে সীতাকুণ্ডের বিস্তীর্ণ জনপদ মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশপ্রেমী ও সচেতন নাগরিকরা।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা মো. ইসমাইল হোসেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "ছোটবেলায় দেখেছি পাহাড় থেকে স্বচ্ছ পানি ছড়া দিয়ে সরাসরি গড়িয়ে আসত, তাতে কখনো জলমগ্নতা হতো না। এখন দখলদারদের কারণে ছড়ার বুক দখল হয়ে গেছে, একটু বৃষ্টি হলেই পাহাড়ি ঢলের পানিতে ঘরবাড়ি ভেসে যায়। আবার গরমে পানির এক ফোঁটা পাই না। এই ছড়াগুলো উদ্ধার না করলে আমাদের কপালে আরও চরম দুর্দশা আছে।"
পাহাড়ি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হওয়া এবং খাল দখলের এই গুরুতর সমস্যার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও এর নেতিবাচক প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট খালগুলো পুনরুদ্ধারে ইতিমধ্যে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, "সীতাকুণ্ডের পাহাড় রক্ষা এবং পাহাড়ি ছড়াগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে যেসব এলাকায় খাল ও ছড়া দখল করে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই অভিযান চালিয়ে সব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে এবং পানি চলাচলের পথগুলো দখলমুক্ত করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে।"
প্রশাসনের তরফ থেকে উচ্ছেদ অভিযানের কঠোর হুশিয়ারি দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষ চায় এর দ্রুত ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন। পাহাড়ের কান্না থামিয়ে এবং ছড়াগুলোর প্রাণ ফিরিয়ে দিয়ে সীতাকুণ্ডের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জনজীবন সুরক্ষিত রাখতে দীর্ঘমেয়াদী তদারকি ও সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে ফিরিয়ে দেওয়ার এই লড়াইয়ে দলমত নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত এগিয়ে আসাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









