আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে যশোরে নিরাপত্তা জোরদার, অপতৎপরতা প্রতিরোধ, উচ্চ শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে প্রশাসন।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ‘অমিত্রাক্ষর’ সভাকক্ষে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় এসব বিষয় উঠে আসে।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সভাপতিত্ব করেন যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান।
পূজামণ্ডপে ডিজে পার্টি ও মদ্যপান করে মাতলামির অভিযোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে পূজার ধর্মীয় পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে বলে সভায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা বলেন, পূজাকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও ডিজে পার্টি, উচ্চ শব্দে গান-বাজনা এবং রাতভর বিনোদনের আয়োজন করা হয়। এর সঙ্গে মদ্যপান করে মাতলামির ঘটনাও ঘটে বলে তারা অভিযোগ করেন। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে পূজামণ্ডপে আগত নারী, শিশু ও বয়স্ক দর্শনার্থীদের ভোগান্তি তৈরি হয় এবং ধর্মীয় উৎসবের পরিবেশও ব্যাহত হয়।
পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের বক্তব্য, দুর্গাপূজা মূলত ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু কিছু স্থানে পূজার নামে ডিজে পার্টি ও উচ্চ শব্দের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ভিন্ন পরিবেশ তৈরি হয়। বিশেষ করে গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে গান-বাজনা, মোটরসাইকেল নিয়ে বেপরোয়া চলাচল এবং মদ্যপ অবস্থায় বিশৃঙ্খলা নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তারা পূজামণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় এসব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি দাবি করেন।
সভায় এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে পূজা উদযাপন কমিটিগুলোকে নিজেদের মণ্ডপে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সভায় প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘‘বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’’ এ কারণে দুর্গাপূজায় অতিরিক্ত আলোকসজ্জা না করে মণ্ডপ ও প্রতিমাকেন্দ্রিক সীমিত পরিসরে আলো ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘‘ব্যাপক আলোকসজ্জা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি জেনারেটর ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করতে হয়। তাই জাতীয় স্বার্থে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’’
সভায় পূজামণ্ডপের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতিমন্ত্রী পূজামণ্ডপে কোনো ধরনের অপতৎপরতা, অনুপ্রবেশ বা পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) নিজ নিজ এলাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথাও বলা হয়।
সভায় জানানো হয়, আগামী ১ অক্টোবর থেকে মোটরসাইকেলসহ সবধরনের যানবাহনে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। অবৈধ মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়। পূজার সময় মণ্ডপকেন্দ্রিক যানবাহন চলাচল, পার্কিং এবং দর্শনার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
এবার যশোর জেলায় ৭৩৭টি স্থায়ী ও অস্থায়ী পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। গত বছর মণ্ডপের সংখ্যা ছিল ৭০৯টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এবার মণ্ডপ বেড়েছে ২৮টি।
সভায় আরও জানানো হয়, দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিটি মন্দিরের জন্য সরকারি চালের বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগে প্রতিটি মন্দিরে ৫০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও এবার তা বাড়িয়ে ১ হাজার কেজি করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পূজামণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নিয়ন্ত্রণ, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, ছিনতাই প্রতিরোধ এবং সন্দেহজনক ব্যক্তিদের ওপর নজরদারির বিষয়েও আলোচনা হয়।
সভায় উচ্চ শব্দ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। পূজামণ্ডপের আশপাশে মাইক, সাউন্ড সিস্টেম ও ডিজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধিনিষেধ মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা প্রশাসনের কাছে দাবি জানান, শুধু পূজার আগের দিন নয়, পুরো পূজার সময় মণ্ডপগুলোতে নিয়মিত নজরদারি রাখতে হবে। বিশেষ করে রাতে মণ্ডপ এলাকায় মদ্যপান, মাতলামি, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো ও উচ্চ শব্দের ডিজে পার্টি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
তারা আরও বলেন, কোনো মণ্ডপে বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে সেটি যেন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও পূজা উদযাপন কমিটির মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন।
সভায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
সভায় জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেরুল হক সাবু, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, জেলার বিভিন্ন থানার ওসি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিজিবি ও এনএসআইয়ের কর্মকর্তা, যশোর প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুনসহ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









