ধান কাটার মৌসুম। মাঠজুড়ে পাকা ধানের গন্ধ। কৃষকের মুখে থাকার কথা হাসি। কিন্তু রাজশাহীর তানোরের রহিমা ডাংগার মাঠে এখন সেই হাসি নেই। বরং ধান কাটার পর হিসাবের খাতা খুললেই সামনে আসছে লোকসান। ৬০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করেও উঠছে না উৎপাদন খরচ। ফলে কৃষিপ্রধান তানোরের কৃষকের ঘরে ঘরে নেমে এসেছে হতাশা।
তানোর উপজেলা কৃষিনির্ভর। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকটাই ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর আউশ ধান কাটার পর আগাম আলু চাষ করেন কৃষকেরা। কিন্তু এবার ধানের দাম এতটাই কম যে, এক মৌসুমের ধান চাষের লোকসান পুষিয়ে নিতে পরের কয়েক মৌসুমও চাষ করতে হবে—এমন আশঙ্কা কৃষকদের।
তানোর পৌর এলাকার রহিমা ডাংগা এলাকায় এবার প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ বিঘা জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়েছে। বছরের পর বছর এ এলাকায় আউশ ধান চাষ হয়ে আসছে। কিন্তু কৃষকদের ভাষায়, এবার ধানের এমন দাম তাঁরা আগে কখনো দেখেননি।
বরুজ গ্রামের তরুণ কৃষক জুয়েল সাত বিঘা জমিতে আউশ ধান চাষ করেছেন। তিনি সেভেন ও ছিয়াত্তর জাতের ধান রোপণ করেছিলেন। ধান কাটা ও মাড়াই শেষ হলেও বিক্রি করতে গিয়ে পড়েছেন বিপাকে।
জুয়েলের আক্ষেপ, ‘চাষাবাদ আমাদের জীবনে অভিশপ্ত হয়ে পড়েছে।’ তিনি জানান, সামান্য কাঁচা থাকায় তার ধান নিতে চাইছিলেন না কেউ। শেষ পর্যন্ত বস্তা ঠিকা বা ৬০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। বিঘাপ্রতি ১৮ থেকে ১৯ মণ ধান হয়েছে।
কৃষকের হিসাব আরও কঠিন। রহিমা ডাংগায় অধিকাংশ কৃষক লিজ নিয়ে জমি চাষ করেন। কারণ আউশ ধান কাটার পর ওই জমিতেই আগাম আলু চাষ করেন তাঁরা। এক বিঘা জমির লিজ বাবদ দিতে হয় ১২ হাজার টাকা।
কৃষকদের হিসাবে, এক বিঘা জমিতে রোপণ থেকে ধান কাটা পর্যন্ত খরচ হয় ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। ধান কাটা ও মাড়াইয়ে লাগে আরও প্রায় ৪ হাজার টাকা। এরপর জমি থেকে রাস্তা এবং রাস্তা থেকে বাড়িতে ধান নিতে দিতে হয় পরিবহন খরচ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সেই ভাড়াও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে লিজের টাকা বাদ দিয়েই এক বিঘায় খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। সেখানে বিঘায় ১৮ মণ ধান হলে ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে পাওয়া যায় ১০ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ শুধু উৎপাদন ও কাটাই-মাড়াইয়ের খরচ ধরলেও লোকসান ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। লিজের টাকা যোগ করলে বিঘাপ্রতি লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা।
এই লোকসানের বোঝা বইছেন শুধু জুয়েল নন। রহিমা ডাংগায় জয়নাল পাঁচ বিঘা, সবুজ নয় বিঘা, ভবেশ পাঁচ বিঘা এবং মইনুল সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে আউশ ধান চাষ করে লোকসান গুনছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, ধান চাষের সার, কীটনাশকসহ প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। বেড়েছে শ্রম ও পরিবহন ব্যয়ও। অথচ ধানের দাম কমছে। তাঁদের দাবি, ধান কাটার মৌসুমে একটি সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়।
কৃষকের প্রশ্ন—‘সবকিছুর দাম বাড়ে, শুধু ধানের দাম কমে কেন?’
তানোরের কৃষকদের দুর্ভোগ শুধু একটি মৌসুমের হিসাব নয়। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে তানোরে ৮ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়েছে। বর্তমানে মাঠে রয়েছে রোপা আমন। এ বছর প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়েছে।

কৃষকেরা বলছেন, তানোরে কৃষিই মানুষের সংসার ও জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। জেলার মধ্যে অন্যতম সর্বাধিক ধান উৎপাদনকারী এ উপজেলায় ধানের দাম পড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষকেরা। ধানই যাঁদের সারা বছরের খাবারের জোগান দেয়, সেই ধানের দাম না থাকায় তাঁদের ঘরে এখন অভাব।
আশি-নব্বইয়ের দশকে কার্তিক মাসকে ঘিরে গ্রামবাংলায় অভাব-অনটন ও দুর্ভিক্ষের কথা শোনা যেত। কৃষকদের ভাষ্য, গত কয়েক বছর ধরে সেই অভাব যেন আবার ফিরে এসেছে। তবে এবার সেই কষ্টের কেন্দ্রে কৃষক নিজেই—যিনি অন্যের ঘরে খাবার পৌঁছে দেন, অথচ নিজের ঘরেই খাদ্যসংকটের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
কৃষকদের ক্ষোভ, তারা মাঠে ঘাম ঝরিয়ে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। অথচ কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। তাঁদের অভিযোগ, কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব কৃষি বিপণন বিভাগের হলেও কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ করে কৃষি বিপণন বিভাগ। কৃষি দপ্তর মূলত কীভাবে চাষাবাদ করতে হবে এবং রোগবালাই কীভাবে দূর করা যায়, এসব বিষয়ে কাজ করে।
ধান ফলিয়ে যদি উৎপাদন খরচই না ওঠে, তাহলে আগামী মৌসুমে তারা কীভাবে আবার মাঠে নামবেন? মাঠে ধান থাকবে, গোলায় ধান থাকবে; কিন্তু সেই ধানের ন্যায্য দাম না থাকলে কৃষকের ঘরে স্বস্তি ফিরবে কীভাবে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









