“সম্মানিত এলাকাবাসী-আসসালামু আলাইকুম। শুভ হালখাতা, শুভ হালখাতা। শাইলকোনা হাসান ভাইয়ের টিলারের শুভ হালখাতা। আজকেই হাসান ভাইয়ের বাড়িতে টিলারের শুভ হালখাতা। উক্ত হালখাতায় আপনাদের উপস্থিতি একান্তভাবে কামনা করছি।” এভাবেই সাত গ্রামে ঘুরে ঘুরে পাওয়ার টিলারের বকেয়া টাকা আদায়ে মাইকিং করা হয়।
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার ফাঁগুয়াড়দিয়াড় ইউনিয়নের সাইলকোনা গ্রামে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ নেন মেহেদী হাসান।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মেহেদী হাসানের বাড়িতে আয়োজন করা হয়েছে হালখাতার। বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে আরও বড় চমক। আমগাছের মগডালে বাঁধা হয়েছে মাইক। সেখান থেকেই বারবার ভেসে আসছে হালখাতার আমন্ত্রণ।
বাড়ির বারান্দায় টেবিল পেতে করা হয়েছে বকেয়া টাকা নেওয়া ব্যবস্থা। ঘরের ভেতরে প্রস্তুত করা হচ্ছে গ্রাহকদের জন্য মিষ্টির প্যাকেট। কেউ বকেয়া টাকা পরিশোধ করলেই তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মিষ্টি।
গ্রামের প্রচলিত হালখাতার সঙ্গে আধুনিক মাইকিংয়ের এমন সংযোগ ইতোমধ্যে স্থানীয়দের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি করেছে।
মেহেদী হাসান পেশায় একজন পাওয়ার টিলার চালক। এইচএসসি পাস করেও চাকরির পেছনে না ছুটে বাবার কৃষি পেশাকেই নিজের জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার সাইলকোনা কৃষি মাঠ ছাড়াও ভূইয়াপাড়া, নওপাড়া, সাতশইল, মাধববাড়িয়া, বাসুপাড়া, কুমারপাড়াসহ আশপাশের প্রায় সাতটি গ্রামের কৃষকের জমি পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করেন মেহেদী হাসান। কৃষকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে অনেক সময় বাকিতেও জমি চাষ করে দেন। ফসল ঘরে ওঠার পর কিংবা সুবিধামতো সময়ে কৃষকরা সেই টাকা পরিশোধ করেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বকেয়া টাকা পরিশোধে অনীহা দেখা দিতে শুরু করে অনেকের মধ্যে। ফলে বকেয়া আদায়ে ব্যতিক্রমীভাবে ‘হালখাতা’ করার সিদ্ধান্ত নেন মেহেদীর বাবা।
বাবার সেই উদ্যোগই এখন পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। বাবা মারা গেলেও তার দেখানো পথ ধরে প্রতি বছর হালখাতার আয়োজন করে আসছেন ছেলে মেহেদী হাসান।
চলতি বছরের জুলাই মাসে নিয়ম মেনে হালখাতার আয়োজন করা হয়। তখন বকেয়া ছিল ২ লাখ ২২ হাজার টাকা। কিন্তু সেবার কৃষকদের কাছ থেকে হালখাতার মাধ্যমে আদায় হয় মাত্র ৫৩ হাজার টাকা।
এরপর কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মেহেদী। তখন অনেকেই জানান, হালখাতার কথা তাদের মনে ছিল না।
এর মধ্যে বকেয়া টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ২২ হাজার ৮৫৩ টাকা। তাই আবারও নতুন করে হালখাতার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে এবার শুধু কার্ড বিলি করেই থেমে থাকেননি। কৃষকদের দিন-তারিখ মনে করিয়ে দিতে আশপাশের সাতটি গ্রামে মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করেন।
হালখাতায় বকেয়া পরিশোধ করতে আসা আব্দুল আজিজ ও জয়নাল আবেদিন বলেন, হাসানের কাছে আমরা জমি চাষ করিয়ে নিই। অনেক সময় হাতে টাকা থাকে না। হালখাতায় এসে টাকা পরিশোধ করে দিই। তবে এবার হালখাতার কথা মাইকিং করে জানানোয় বিষয়টি সবার মনে থাকবে।
পাওয়ার টিলার চালক মেহেদী হাসান বলেন, ‘‘আমার বাবা কৃষি কাজ করতেন। তার কাছ থেকেই কৃষকদের সঙ্গে এভাবে কাজ করার বিষয়টি শিখেছি। কৃষকেরা যেন চাষের সময় টাকার জন্য সমস্যায় না পড়েন, সেজন্য অনেক সময় বাকিতে জমি চাষ করে দিই।’’
তিনি আরও বলেন, “কিন্তু বকেয়া টাকা জমতে জমতে বড় অঙ্ক হয়ে যায়। অনেকে সময়মতো দিতে পারেন না, আবার অনেকে হালখাতার কথাও মনে রাখেন না। তাই এবার কার্ড দেওয়ার পাশাপাশি সাতটি গ্রামে মাইকিং করেছি, যাতে সবাই দিন-তারিখ মনে রাখতে পারেন।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









