বরিশালের উজিরপুরে বাবা আলী আকবর হাওলাদারকে হত্যার দায়ে ছেলে পলাশ হাওলাদারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বরিশালের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. সোহেল আহমেদ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার সময় আসামি পলাশ হাওলাদার আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। একই মামলায় অভিযুক্ত কাওসার হাওলাদার ও মিজান হাওলাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত পলাশ হাওলাদার উজিরপুর উপজেলার পরমানন্দ সাহা গ্রামের মৃত আলী আকবর হাওলাদারের ছেলে। নিহত আলী আকবর পেশায় দিনমজুর ছিলেন। তার স্ত্রীও আগে মারা যান।
মামলার নথি ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, পলাশ প্রথমে সাকরাল গ্রামের ইসমাইল হোসেনের মেয়ে জ্যোৎস্না আক্তারকে বিয়ে করেন। প্রায় এক বছর সংসার করার পর পরিবারের মতের বাইরে গিয়ে ভদ্র গ্রামের শাহ আলম রাঢ়ীর মেয়ে সুইটি বেগমকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস শুরু করেন তিনি।
পলাশ দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে বাবার বাড়িতে উঠতে চাইলে আলী আকবর এতে আপত্তি জানাতেন। এ নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রথম স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগে পলাশের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন জ্যোৎস্না। ওই মামলায় কিছুদিন কারাভোগের পর জামিনে বের হন পলাশ।
বাদীর অভিযোগ ছিল, ওই মামলা দায়েরের পেছনে বাবা আলী আকবরের ইন্ধন রয়েছে, এমন ধারণা থেকে পলাশ তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১০ সালের ২ মে সন্ধ্যার পর বাবা আলী আকবরের সঙ্গে পলাশের তুমুল বাগ্বিতণ্ডা হয়। ওই দিন দিবাগত রাতে পলাশসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন ঘুমন্ত আলী আকবরকে ঘর থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান।
পরদিন ৩ মে ভোর সাড়ে ৬টার দিকে প্রতিবেশী আলমগীর হাওলাদার পাশের একটি ধানক্ষেতে আলী আকবরকে হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান। তার চোখ-মুখও গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। বিষয়টি তিনি পরিবারের সদস্যদের জানান।
পরে স্বজনেরা ঘটনাস্থল থেকে আলী আকবরকে উদ্ধার করে প্রথমে উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, আলী আকবরকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বরিশালে নেওয়ার সময় পলাশও সেখানে ওঠেন। একপর্যায়ে তিনি বাবার গায়ে হাত দিতে চাইলে আলী আকবর তার হাত সরিয়ে দেন। তবে গুরুতর আহত থাকায় তিনি তখন কথা বলতে পারেননি।
পরে নিহতের ছোট ছেলে সবুজের কাছ থেকে ওই রাতে পলাশ ও তার সহযোগীদের বাবাকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানতে পারেন বড় ছেলে শহিদ হাওলাদার। এরপর তিনি উজিরপুর থানায় গিয়ে হত্যা মামলা করেন।
মামলাটি তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ২৫ মার্চ উজিরপুর মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকুমার রায় পলাশ হাওলাদার, কাওসার হাওলাদার ও মিজান হাওলাদারকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা শেষে বুধবার আদালত পলাশ হাওলাদারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে কাওসার হাওলাদার ও মিজান হাওলাদারকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









