‘মোর মানিকেরে আইনে দেও মোর কোলে।’ সৌদি আরবে একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে বুকফাটা কান্নায় বারবার এই আকুতি জানাচ্ছেন বরগুনার তালতলী উপজেলার ছাহেরা বেগম। যে ছেলেকে ঘিরে স্বামীহারা মায়ের বেঁচে থাকার স্বপ্ন ছিল, সেই ছেলেই আজ দূরদেশে নিথর। অথচ শেষবারের মতো ছেলের মুখটি দেখার সামর্থ্যও নেই তার।
ছাহেরা বেগমের একমাত্র ছেলে হানিফের বয়স হয়েছিল ৩৬ বছর। ৩ অক্টোবর সৌদি আরবে তার মৃত্যু হয়। তবে কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো জানতে পারেনি পরিবার। ছেলের মৃত্যুর শোকের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দুশ্চিন্তা। অসহায় এই মা তাই সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
হানিফ বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া এলাকার প্রয়াত জালাল মিয়ার ছেলে। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় আড়াই বছর আগে ধারদেনা করে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। বিদেশে গিয়েও স্বস্তি মেলেনি। ভিসা বৈধ করার আশায় পাঁচ মাস আগে বিভিন্ন ব্যাংক ও বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন হানিফ।
সব মিলিয়ে পরিবারের ওপর জমেছে ঋণের পাহাড়। এরই মধ্যে উপার্জনক্ষম একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা মা। অন্যদিকে স্বামীকে হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন হানিফের স্ত্রী কাজল আক্তার। তাদের ১১ বছর বয়সী একটি ছেলে ও পাঁচ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। বাবার মৃত্যুতে দুই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
ছাহেরা বেগমের কাছে এখন ঋণ শোধ কিংবা সংসারের হিসাবের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে ছেলের মরদেহ একবার দেখার আকুতি। স্বামীকে হারানোর পর একমাত্র ছেলেকে আঁকড়েই বেঁচে ছিলেন তিনি। সেই ছেলেও চলে গেল না-ফেরার দেশে। দূর সৌদি আরবে পড়ে থাকা সন্তানের মুখটি শেষবারের মতো দেখতে চান এই মা।
পরিবারটির অসহায়ত্বের বিষয়টি জানার পর তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
এখন ছাহেরা বেগমের অপেক্ষা—কবে ফিরবে তার মানিক, কবে শেষবারের মতো ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন তিনি। যে ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে ঋণের বোঝা কাঁধে নিতে হয়েছিল, সেই ছেলের মরদেহ ফেরাতেও আজ তাকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে অন্যের সহযোগিতার দিকে।
অসহায় এই মায়ের আকুতি, অন্তত শেষবারের মতো যেন ছেলের মুখটি দেখতে পারেন তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









