ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মধ্যে সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনোর আহ্বান জানিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে দুই পক্ষের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে প্রাণঘাতী হামলার পর আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ নিল দেশটি।
রবিবার (১১ অক্টোবর) সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এ প্রস্তাব দেন। সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ও ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আরাঘচি বলেন, ‘সামরিক পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া এবং রাজনৈতিক সমাধান উপেক্ষা করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।’
তার মতে, আঞ্চলিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে এবং রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে সহায়তা করতে ইরান প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
সৌদি আরবের ওপর ইয়েমেনের হুতিদের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে এ উদ্যোগ এল। শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন বলে জানিয়েছিল সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। পরে হামলায় আহত এক ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়ায় বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও সংলাপের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকুক, তা তেহরান চায় না।
বাঘাই বলেন, ‘দুটি মুসলিম দেশের মধ্যে শত্রুতা চলতে থাকুক, আমরা তা চাই না। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো অঞ্চল আগে থেকেই উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধমুক্ত মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার ইয়েমেনের জনগণের রয়েছে। সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানে ইরান তার প্রস্তুতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
এদিকে, রবিবার হুতিদের আরেকটি হামলায় সৌদি আরবে বসবাসরত এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হন এবং আরও ১১ জন আহত হন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সৌদি রাজধানীতে ফ্লাইট পরিচালনাও সীমিত হয়ে পড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লুফথানসা ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম তাদের ফ্লাইট স্থগিত রাখার মেয়াদ অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
হুতিদের নতুন হুঁশিয়ারি
সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করতে বিমান সংস্থা, নৌপরিবহন কোম্পানি, বিমানবন্দরের কর্মী এবং যাত্রীদের সতর্ক করেছে হুথিরা। তবে মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দরকে এ সতর্কতার বাইরে রাখা হয়েছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহনের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানি, বিশেষজ্ঞ, কর্মী এবং যাত্রীদের প্রতি তাদের সতর্কবার্তা আবারও জানানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী সব বিমান ও নৌপরিবহন সংস্থা, বিশেষজ্ঞ, কর্মী এবং যাত্রীদের সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করার বিষয়ে আবারও সতর্ক করছে।’

তার ভাষ্য, মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দর ছাড়া সৌদি আরবের অন্যান্য বিমানবন্দর ও আকাশসীমা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্কবার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র বা হামলা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলে তার দায় সৌদি আরবকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন।
আনুষ্ঠানিকভাবে আনসার আল্লাহ নামে পরিচিত হুথিরা রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা দাম্মাম বিমানবন্দর এবং সৌদি আরামকোর স্থাপনাগুলোতে হামলার কথাও জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলাকে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ’ বলে বর্ণনা করেছে।
পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে রয়েছে ইরান ও সৌদি আরব। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তির মাধ্যমে সাত বছরের বিচ্ছেদের অবসান ঘটিয়ে দেশ দুটি কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও দুই দেশের সরকারের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রয়েছে। সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাতের মধ্যে ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাব সেই যোগাযোগেরই একটি নতুন পরীক্ষা।
তবে সংলাপের আহ্বান সংঘাত থামাতে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে আসার ইচ্ছার ওপর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









