শরতের পড়ন্ত বিকেল। নদীর বুকে একের পর এক ছুটে চলেছে রঙিন পানসি নৌকা। মাঝিদের হাতে বৈঠা, কণ্ঠে জারি-সারি আর লোকগান। কখনো একটি নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে, পরক্ষণেই পেছন থেকে আরেকটি নৌকা এসে দিচ্ছে জোর টক্কর। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো মানুষের করতালি আর উচ্ছ্বাসে মুখর চারপাশ। সব মিলিয়ে যেন গ্রামবাংলার চিরচেনা এক উৎসব ফিরে এসেছে গুমানি নদীর বুকে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার নৌবাড়ীয়ায় গুমানি নদীতে অনুষ্ঠিত হয় ‘প্রভাষক জাফর ইকবাল হিরোক পানসি নৌকা বাইচ-২০২৬’-এর ফাইনাল। চলনবিল অধ্যুষিত এ জনপদে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ ঘিরে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নদীর বুকে নৌকার প্রতিযোগিতা দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ।
বৈঠার টানে নৌকাগুলো যখন পানির বুক চিরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন দর্শকদের চোখ ছিল প্রতিযোগীদের দিকে। একবার একটি নৌকা এগিয়ে যায়, আবার মুহূর্তেই অন্য নৌকা এসে ব্যবধান কমিয়ে আনে। প্রতিটি বাঁক আর গতির পরিবর্তনে বাড়তে থাকে উত্তেজনা। মাঝিদের কণ্ঠে ভেসে আসা জারি-সারি ও লোকগানের সুর যেন প্রতিযোগিতার আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
নৌকা বাইচ শুধু কে আগে গন্তব্যে পৌঁছাবে, সেই লড়াই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর মানুষের সম্মিলিত আনন্দ। নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদে এমন আয়োজন মানুষের মধ্যে তৈরি করে মিলনমেলা। গুমানি নদীর দুই পাড়ে মানুষের উপস্থিতিও সেই আনন্দেরই প্রকাশ।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার। চূড়ান্ত পর্বের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর প্রথম স্থান অধিকারী নৌকার জন্য ছিল এক লাখ টাকা, দ্বিতীয় পুরস্কার ৬০ হাজার টাকা, তৃতীয় পুরস্কার ৪০ হাজার টাকা এবং চতুর্থ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ভাঙ্গুড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুল মতিন রাজু। উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব প্রভাষক সরদার জাফর ইকবাল হিরোক বলেন, নৌকা বাইচ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের অংশ। এ প্রতিযোগিতা দেখতে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতি সবাইকে মুগ্ধ করেছে। আবহমান গ্রামবাংলার কৃষ্টি ধরে রাখতে প্রতিবছরই এ ধরনের আয়োজনের চেষ্টা থাকবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ভাঙ্গুড়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুর মোজাহিদ স্বপন, পাবনার ফরিদপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভিপি আব্দুল হাকিম খান, চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম কালু, ফরিদপুর উপজেলার হাদল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ্ আলম, ভাঙ্গুড়া উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি আখিরুজ্জামান মাসুমসহ বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
শরতের বিকেলে গুমানি নদীর বুকে বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের গান আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে নৌকা বাইচ হয়ে ওঠে প্রাণের উৎসব। প্রতিযোগিতার শেষ বাঁশি বেজে গেলেও নদীর দুই পাড়ে ছড়িয়ে থাকা আনন্দ যেন মনে করিয়ে দেয়—গ্রামবাংলার ঐতিহ্য কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, মানুষের অংশগ্রহণেই তা বারবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









