সাহিত্যে নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের সাথে যে নামটি সবচেয়ে আলোচিত ছিল তিনি হলেন চীনা অ্যাভাঁ-গার্দ লেখক কান শুয়ে। তার কথাসাহিত্যকে প্রায়ই একটি ‘পারফরম্যান্স’ বা মঞ্চায়ন হিসেবে বর্ণনা করেন। তার লেখা পড়া আধুনিক নৃত্য দেখার মতো। মার্স কানিংহামের নৃত্য কিংবা তার প্রিয় জাপানি বুটোহ নৃত্যের মতোই তার বাক্য এগোয়—কিন্তু কোথায় গিয়ে থামবে, তা আগে থেকে বোঝা যায় না। হঠাৎ কোনো তীক্ষ্ণ, অপ্রত্যাশিত জায়গায় গিয়ে শেষ হয়।
কান শুয়ের গল্পের ভেতরে প্রায়ই একটি গোপন কাহিনি কাজ করে। যেন দৃশ্যমান ঘটনার নিচে আরেকটি অদৃশ্য জগত আছে, যা মঞ্চের চরিত্রগুলোর চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করছে। তার চরিত্রগুলোও প্রচলিত অর্থে পূর্ণাঙ্গ চরিত্র নয়। তাদের উদ্দেশ্য বদলায়, পরিচয় বদলায়। তারা যেন ‘পারসোনা’—মুখোশ। গল্পের মুহূর্তে যে দার্শনিক প্রশ্ন বা মনের যে দিকটি প্রকাশ করা দরকার, সেই মুখোশটি তখন তার ভাষা হয়ে ওঠে। ‘দ্য চাইল্ড হু রেইজড পয়জনাস স্নেকস’-এর সেই ছোট ছেলেটি, যে গোপনে নিজের পেটে একদল সাপ পোষে; কিংবা ‘ভার্টিক্যাল মোশন’-এর সেই কেঁচোর মতো মানুষ, যে মাটির নিচে বাস করে এবং অজানা পৃথিবীর দিকে গর্ত করে ওপরে উঠতে থাকে—তারা এই মুখোশগুলোরই অংশ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘পারসোনা’ অবশ্য কান শুয়ে নিজেই। এটি তার ছদ্মনাম। তার আসল নাম দেং শিয়াওহুয়া। তিনি প্রায়ই নিজের কথা তৃতীয় পুরুষে বলেন, এমনকি নিজের উপন্যাসের সমালোচনাও নিজেই লেখেন। যেন তার স্বপ্নের মতো, পরিবর্তনশীল জগতটি তার নিজের ভেতর থেকে নয়, কোথাও বাইরের কোনো অদৃশ্য স্থান থেকে এসেছে।
যারা তার লেখাকে শ্রেণিবদ্ধ করতে বা সহজ কোনো ব্যাখ্যায় বন্দী করতে চান, তাদের প্রতি কান শুয়ে প্রায় উদাসীন। তার পরিবারকে চীনের কমিউনিস্ট সরকার ‘ডানপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং তাদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়েছিল। সামাজিক অবস্থানের কারণে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষাও পাননি। তবু ১৯৮০-এর দশকের ‘হাই কালচার ফিভার’ বা উচ্চ সংস্কৃতির উন্মেষের সময় তিনি উঠে আসেন। সু থং, মো ইয়ান, ইউ হুয়ার মতো লেখকদের সঙ্গে তিনি চীনা সাহিত্যের সেই নতুন প্রজন্মের অংশ হয়ে ওঠেন, যে ধারা সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
তবে তার পথ ছিল আলাদা। তার সমসাময়িক অনেক লেখক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ক্ষত নিয়ে লিখেছেন, কেউ কেউ খুঁজেছেন এক নিষ্কলুষ অতীত বা প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতি। কান শুয়ের তেমন আগ্রহ নেই। চীনা লোককথা কিংবা সরাসরি রাজনীতি তার লেখার কেন্দ্র নয়। বরং তিনি জায়গা, শরীর, চেতনা এবং কাহিনির যুক্তিকে এমনভাবে বদলে দেন যে তার লেখা কখনো কখনো তার প্রিয় পশ্চিমা আধুনিকতাবাদী লেখক—কাফকা, বোর্হেস কিংবা কালভিনোর—চেয়েও বেশি দুঃসাহসী মনে হয়।
তার লেখা প্রকাশ করেছে ‘কনজাংশন্স’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যপত্র। রবার্ট কুভার তাকে বলেছেন ‘বিশ্বসাহিত্যের একজন মহীরুহ’। সুসান সন্টাগ তাকে নোবেল পাওয়ার যোগ্য একমাত্র চীনা লেখক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। চীনের অ্যাভাঁ-গার্দ সাহিত্যের অন্য অনেক লেখক পরে সহজবোধ্য বাস্তববাদের দিকে ফিরেছেন। কান শুয়ে ফিরেননি। তিনি নিজের কঠিন, পরীক্ষামূলক পথেই থেকে গেছেন।
এই অর্থে তার লেখালেখি শুধু সাহিত্যিক পরীক্ষা নয়; এটি অস্তিত্বের সংগ্রাম।
‘স্নেক আইল্যান্ড’ গল্পে একজন মানুষ ৩০ বছর পর নিজের গ্রামে ফিরে আসে। কিন্তু সে কিছুই চিনতে পারে না—কাউকে নয়, কোনো জায়গাকে নয়। তার পরিবারও নেই। গল্পের শেষ দিকে এক গ্রামবাসী তাকে যুদ্ধে যোগ দিতে ডাকে। সে জানায়, স্নেক আইল্যান্ড দুই ভাগে বিভক্ত—জীবিতদের পৃথিবী এবং মৃতদের পৃথিবী। বেঁচে থাকা মানুষদের মৃতদের সঙ্গে জায়গার জন্য লড়াই করতে হয়।
এই লড়াই কান শুয়ের নিজেরও। আত্মার মৃত্যু ঠেকিয়ে সত্যিকারের জীবনের জন্য লড়াই করা। সেই লড়াই শেষ হয় না। তার পারফরম্যান্সও শেষ হয় না।
সাক্ষাৎকারটি চীনা ভাষায় ই-মেইলের মাধ্যমে ‘অ্যাসিম্পটো’-পোর্টালের জন্য নেওয়া হয়েছিল। পরে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করে ডিলান সুহার। দৈনিক এদিন অনলাইন পাঠকের জন্য সাক্ষাৎকারটি বাংলায় ভাষান্তর করল। আসুন পাঠক প্রশ্ন উত্তরের মধ্য দিয়ে কান শুয়ের চিন্তার জগতে প্রবেশ করি।

প্রশ্ন: আপনার লেখার ইংরেজি অনুবাদক সময়ের সঙ্গে বদলেছেন। প্রথম তিনটি সংকলন অনুবাদ করেছিলেন রোনাল্ড আর. জ্যানসেন ও জিয়ান ঝাং। সাম্প্রতিক তিনটি করেছেন ক্যারেন জার্নান্ট ও চেন জেপিং। অনুবাদকদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন? আপনার মতে, কান শুয়ের গল্প অনুবাদ করতে একজন অনুবাদকের কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন?
কান শুয়ে: আমার সব ইংরেজি অনুবাদকের সঙ্গেই বন্ধুত্ব আছে। মোট পাঁচজন ইংরেজি অনুবাদক আছেন। রন জ্যানসেন ও জিয়ান ঝাং একসঙ্গে অনুবাদ করেন। ক্যারেন জার্নান্ট ও চেন জেপিংও জুটি হিসেবে কাজ করেন। আর আছেন অ্যানেলিস।
১৯৯০-এর দশক থেকে আমি ইংরেজি শেখার ব্যাপারে খুব মন দেই এবং ভাষাটিতে মোটামুটি ভালো দক্ষতা অর্জন করেছি। ক্যারেন ও চেন আমার লেখা অনুবাদ করা শুরু করার পর থেকে আমি তাদের অনুবাদ নিজে পড়ি এবং মতামত দিই। পরে অ্যানেলিসের অনুবাদও পড়েছি।
কান শুয়ের লেখা সত্যিই আলাদা ধরনের। আমার মনে হয়, একজন অনুবাদকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো মূল লেখাটি গভীরভাবে পড়তে পারা। শুধু অর্থ বুঝলেই হবে না; লেখার ভেতরের সূক্ষ্ম রসিকতা, ভাষার সামগ্রিক আবহ এবং গভীর অনুভূতিটাও বুঝতে হবে।
কোনো কিছু অনুবাদে কতটা নিখুঁতভাবে প্রকাশ করা গেল, তা অনুবাদকের অনুভব করার ক্ষমতা এবং যুক্তি ধরতে পারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কারণ এই ধরনের লেখা দর্শনের গভীরতাকেও অতিক্রম করে যায়।
এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় এই ধরনের অভিজ্ঞতা নিয়ে যাওয়া খুব কঠিন। চীনা ভাষায় অর্থ অনেক সময় গভীরে লুকিয়ে থাকে। অনুভূতির সূক্ষ্মতা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজি তুলনামূলক সরাসরি এবং স্পষ্ট পার্থক্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই দুই ভাষার মধ্যকার সেই সূক্ষ্ম ‘মাত্রা’ ঠিকভাবে ধরাই সবচেয়ে কঠিন।
প্রশ্ন: আপনি অত্যন্ত বেশি লিখেছেন—শতাধিক ছোটগল্প, বহু উপন্যাসিকা ও সমালোচনামূলক প্রবন্ধ। কিন্তু ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে তার চেয়ে কম। এমন কোনো লেখা আছে, যেগুলোর ইংরেজি অনুবাদ দেখতে চান?
কান শুয়ে: এখন পর্যন্ত আমার দুটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস অনূদিত হয়েছে। আমার উপন্যাসিকা ‘দ্য লাস্ট লাভার’-এর অনুবাদও সম্প্রতি প্রকাশের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে। সেটি তখন সম্পাদনার পর্যায়ে ছিল এবং ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশের কথা ছিল।
আমার কয়েক ডজন মাঝারি ও ছোট আকারের লেখা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। হিসাব করে দেখেছি, প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ চীনা অক্ষর ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। এটাকে কি সত্যিই সামান্য বলা যায়?
আমি নিয়মিত লিখি। একজন লেখকের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে এমন ধারাবাহিকতা বজায় রাখা খুব কঠিন। আমার বড় স্বপ্ন হলো, আমার সব লেখা যেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন: আপনার লেখার প্রক্রিয়া নিয়ে আপনি বলেছেন, আপনার লেখা আসে অবচেতন মন থেকে। একজন ভালো লেখক কী লিখছেন, তা তাঁর নিজেরও পুরোপুরি জানা উচিত নয়। গল্প শুরু করার সময় আপনি কী ভাবেন?
কান শুয়ে: শুধু অবচেতন মনই এখানে নির্ধারক নয়। প্রত্যেক মানুষেরই অবচেতন আছে। আসল প্রশ্ন হলো, আপনি তাকে সৃষ্টির কাজে যুক্ত করতে পারেন কি না।
এখানে একটি জটিল প্রক্রিয়া কাজ করে। দর্শন ও শিল্পের দিক থেকে আমি সেটি ব্যাখ্যা করতে পারি। পাঁচ-ছয় বছর পর আমি ‘ফিলোসফি অব আর্ট’ নামে একটি বই লিখতে চাই। সেখানে শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতা এবং পশ্চিমা দর্শন নিয়ে আমার দীর্ঘ গবেষণার ভিত্তিতে এসব বিষয়ে বিস্তারিত বলব।
আমি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লিখছি। আমার লেখার পদ্ধতি আসলে আধুনিক শিল্পের সৃষ্টিপদ্ধতি। যুক্তি দূর থেকে নজর রাখে। আবেগকে পুরোপুরি মুক্ত করে দিই। তারপর চেতনার অন্ধকার গহ্বরের দিকে ফিরে যাই এবং সেখানে ডুব দিই। এই দুই শক্তির টানাপোড়েনের মধ্যে আমার গল্পের বিস্ময়কর, আদর্শবাদী কাহিনি তৈরি হয়।
আমার মনে হয়, আমার মতো করে লিখতে হলে একজন লেখকের ভেতরে বিপুল আদিম শক্তি এবং শক্তিশালী যুক্তিবোধ—দুটিই থাকতে হবে। তবেই বিভক্ত চেতনার মধ্যেও সৃষ্টিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব। চীনে এমন কোনো লেখককে আমি দেখিনি, যিনি বহু বছর ধরে এভাবে সৃষ্টিশীলতা ধরে রাখতে পেরেছেন।
প্রশ্ন: আপনার গল্পের কাঠামো এত জটিল যে কাহিনির গঠন কিংবা ছবিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা কঠিন। তাহলে আপনি একটি গল্প তৈরি করেন কীভাবে? সম্পাদনাই বা করেন কীভাবে?
কান শুয়ে: আমি কখনো গল্প সম্পাদনা করি না। কলম হাতে নিই এবং লিখতে শুরু করি। প্রতিদিন একটি অনুচ্ছেদ লিখি। ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এভাবেই লিখছি। আমার বিশ্বাস, আমার মধ্যে একটি শক্তিশালী ‘আভা’ আছে। সেটিই আমার সাফল্যের রহস্য। সফল শিল্পীরা সবাই শক্তির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তাদের মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা থাকে।
প্রশ্ন: প্রতিদিন একটি অনুচ্ছেদ বলতে কি গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে লেখেন? নাকি পরে বিভিন্ন অনুচ্ছেদ একত্র করেন?
কান শুয়ে: আমার সব লেখা—উপন্যাস, উপন্যাসিকা, ছোটগল্প—শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে লেখা হয়। কখনো আলাদা অংশ লিখে পরে সাজাই না। আমার পাণ্ডুলিপি খুব পরিষ্কার। খুব, খুব কম ক্ষেত্রেই একটি শব্দও সংশোধন করি।
প্রশ্ন: আপনার লেখায় স্থান বা ‘স্পেস’ বারবার বদলে যায়। কোথাও অসম্ভব জায়গা, কোথাও গল্পের সঙ্গে সঙ্গে জায়গার মাত্রা ও বাস্তবতা বদলে যায়, কোথাও আবার জায়গাটি সম্পূর্ণ অস্পষ্ট। কল্পকাহিনিতে স্থান নিয়ে এই খেলা আপনাকে কী আকর্ষণ করে?
কান শুয়ে: শুধু সেই লেখকই প্রচলিত স্থানকে ভেঙে আদিম ও সম্পূর্ণ কল্পনাময় ভূদৃশ্যে প্রবেশ করতে পারেন, যার যুক্তিবোধ খুব শক্তিশালী।
দান্তে এমন একজন লেখক। তার নরকের ভূদৃশ্য আকাঙ্ক্ষা ও শক্তিতে পূর্ণ। সেখানে জেগে ওঠা আত্মাগুলো জীবন ও মৃত্যুর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়। সংগ্রাম থেমে গেলে সেই জায়গাও সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায়। আমি যে সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার কথা বলেছি, এটিই তার অংশ। একজন লেখক অপরিচিত স্থান সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে নিজের প্রাণশক্তি প্রকাশ করেন।
প্রশ্ন: আপনার লেখায় বিকৃত শরীর, ভয়াবহতা ও সহিংসতা বারবার আসে। ১৯৮০-এর দশকের অন্য চীনা অ্যাভাঁ-গার্দ লেখকদের সঙ্গেও এর মিল আছে। বিশেষ করে ইউ হুয়ার প্রথম দিকের লেখার সঙ্গে কিছুটা মিল পাওয়া যায়। সহিংসতা নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের থেকে কীভাবে আলাদা?
কান শুয়ে: শুধু সহিংসতা দেখানোর জন্য সহিংসতা লেখা অশালীন এবং রুচিহীন। কিছু চীনা লেখক সহিংসতা বর্ণনা করতেই আনন্দ পান। সেটি আসলে বিকৃতির প্রকাশ; তার ভেতরে কোনো গভীরতা নেই। ইউ হুয়ার প্রথম দিকের কয়েকটি গল্পে সহিংসতার ব্যবহার অসাধারণ। যেমন ‘মিস্টেকস বাই দ্য রিভারসাইড’ সংকলনের কিছু লেখা। আমি সেই বইয়ের সমালোচনাও লিখেছি। কিন্তু তার কিছু গল্পে সহিংসতার কোনো গভীরতা নেই। সৃষ্টির সময় তার আত্মসচেতনতা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
মো ইয়ানের কিছু সহিংস দৃশ্যও বিকৃত ও নিম্নরুচির। কোনো কিছুর ‘গভীরতা’ বলতে আমি কী বুঝি? বুঝি, সহিংসতারও একটি রূপ থাকতে হবে, তার মধ্যে একটি অধিবিদ্যাগত অর্থ থাকতে হবে। দান্তের নরকের দৃশ্যগুলোর মতো। সেগুলো মানুষের আত্মার গভীরতম সংগ্রামকে প্রকাশ করে। পাঠক দান্তের ভয়ংকর ছবিগুলো দেখেন, কিন্তু সেই ছবিই তাকে তার সবচেয়ে নির্মল আদর্শের দিকে আকৃষ্ট করে।
আপনার প্রশ্ন আমার লেখাকে ১৯৮০-এর দশকের অন্য লেখকদের সঙ্গে একসঙ্গে ফেলেছে। এতে বোঝা যায়, আপনি কান শুয়ের লেখা যথেষ্ট গভীরভাবে পড়েননি। আপনাকে আরও পড়তে হবে!

প্রশ্ন: আপনি পাঠকের কাছ থেকে এক ধরনের সক্রিয় অংশগ্রহণ আশা করেন। বলেছেন, আপনার লেখার কৌশল বুঝতে হলে পাঠককে আধুনিকতাবাদ সম্পর্কে যথেষ্ট জানতে হবে এবং আপনার লেখার গভীর কাঠামো বোঝার জন্য পরিশ্রম করতে হবে। তাহলে পাঠকদের সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন? চীনা ও বিদেশি পাঠকের প্রতিক্রিয়ায় কি পার্থক্য দেখেন?
কান শুয়ে: চীনে আমি পাঠকদের সঙ্গে প্রায়ই যোগাযোগ করি। আমার অনেক সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। ইন্টারনেটেও আমি পাঠকদের সঙ্গে কথা বলি।
আমি আমার সহলেখকদেরও প্রায়ই সমালোচনা করি। এতে প্রায় সব লেখক ও সমালোচকই কোনো না কোনোভাবে আমার ওপর বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু যুক্তির কথা বলা এবং নিজের সমালোচনামূলক অবস্থান ধরে রাখা আমার কর্তব্য। চীনে কান শুয়ের ভক্তের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এখনো বলা যায়, কান শুয়ের যুগ আসেনি। কারণ তার লেখা সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে এবং প্রচলিত নান্দনিকতার সঙ্গে মেলে না।
তাই আমাকে আমার কাজ করে যেতে হবে—আমার লেখাগুলোকে অস্তিত্বে নিয়ে আসার কাজ। চীনা পাঠক ও বিদেশি পাঠকের প্রতিক্রিয়া প্রায় একই হওয়া উচিত। কারণ আমার বিষয় মানুষের সার্বজনীন প্রকৃতি—প্রকৃতির আদিম মুখ।
প্রশ্ন: ‘মানুষের সার্বজনীন প্রকৃতি—প্রকৃতির আদিম মুখ’ বলতে আপনি কী বোঝেন? আপনার গল্পে প্রকৃতি কখনো আত্ম-আবিষ্কারের প্রতিপক্ষ, কখনো জীবনের এমন সত্য, যা পৃষ্ঠের ঠিক নিচে লুকিয়ে আছে। প্রকৃতির এসকল ছবির সাথে আপনার নিজের প্রকৃতিবোধের সম্পর্ক কী?
কান শুয়ে: আমার দৃষ্টিতে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক হলো—তাদের কাঠামো একই, তাদের শরীর একই মাংস দিয়ে তৈরি।প্রকৃতি অস্তিত্বের সর্বোচ্চ রূপ। কোনো কোনো সময়ে সে এমন কিছু সৃষ্টি করে, যা মানুষের সমপর্যায়ের। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতি নিজের সারবত্তা প্রকাশ করে। তবে আমি সর্বেশ্বরবাদী নই। আমার মনে হয়, এটি প্রকৃতির নিজস্ব কাঠামোগত কাজের ফল।
প্রকৃতি মানুষকে একটি দায়িত্ব দিয়েছে—সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃতির উদ্দেশ্যকে বাস্তব করে তোলা। তাই মানুষ ও প্রকৃতির কাঠামোগত ভূমিকার মধ্যে গভীর মিল আছে। আমরা প্রকৃতির সন্তান। আমাদের শরীরও আমাদের মায়ের শরীরেরই অংশ।
আমি প্রকৃতিতে বিশ্বাস করি। একজন চীনা মানুষ হিসেবে এটা আমার কাছে স্বাভাবিক। তাই আমার লেখায় অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব, আত্মিক ও বস্তুগত, চিন্তা ও পদার্থ, এপারের পৃথিবী ও ওপারের পৃথিবী—সব একসঙ্গে থাকে এবং একই সঙ্গে একে অপরকে প্রতিরোধ করে।
বিরোধী শক্তিগুলো জীবন-মৃত্যুর সংগ্রামে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু সেই সংগ্রামের মধ্যেই তারা এক ধরনের ভারসাম্য ও সাম্য তৈরি করে। এই জায়গায় আমার চিন্তা পশ্চিমা সংস্কৃতির সঙ্গে অনেকটাই বিরোধী। যদিও আমার এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে পশ্চিমা সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ ও গভীর অধ্যয়নের মধ্য দিয়েই।
প্রশ্ন: আপনি কাফকা নিয়ে দীর্ঘদিন লিখেছেন। তার প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ভীষন আলাদা। কাফকার কাজকে আপনি একই সঙ্গে ট্র্যাজিক এবং এক ধরনের আনন্দময় স্বাধীনতায় পূর্ণ বলেছেন। তার প্রতি আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে তৈরি হলো?

কান শুয়ে: কাফকা সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা সত্যিই কিছুটা আলাদা। আমার মনে হয়, এর প্রধান কারণ হলো আমি কাফকাকে বোঝার সময় পূর্বের কিছু উপাদান ব্যবহার করেছি। পশ্চিমাদের ধর্মীয় চেতনা কাফকার জীবনে গভীর যন্ত্রণা তৈরি করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাকে অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই জীবনপরিস্থিতি তার সৃষ্টিশীলতাকেও সীমিত করেছিল।
অন্যদিকে, আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতি একসঙ্গে আছে। তাই আমি দৈনন্দিন পৃথিবীর দিকে অপেক্ষাকৃত খোলা মনে তাকাতে পারি এবং তার গভীর কালো রসিকতাও সহ্য করতে পারি। তাই ‘দ্য ক্যাসল’, ‘আমেরিকা’ ইত্যাদি পড়ার সময় আমি সেগুলোর প্রাণশক্তি, আদিম বিদ্রোহ, উন্মুক্ত উল্লাস এবং জীবনের শক্তিশালী অর্থের দিকে বেশি আগ্রহী থাকি।
আমার মনে হয়, এই জায়গায় আমি অস্তিত্ববাদকে অতিক্রম করেছি এবং চীনা রঙের একটি শিল্পদর্শনের প্রস্তাব করছি।কাফকা, দান্তে, কালভিনো এবং তাদের মতো শিল্পীদের মধ্যে যে শিল্পদর্শনের মিল আছে, আমি সেটি অনুসন্ধান করি। ত্রিশ বছরের সৃষ্টিশীল অভিজ্ঞতা সমালোচনামূলক লেখায় প্রয়োগ করেই আমি এই জায়গায় পৌঁছেছি। কাফকা ছাড়াও আমি দান্তে, বোর্হেস, কালভিনো, গ্যেটে, শেক্সপিয়রসহ আরও অনেক লেখককে নিয়ে লিখেছি। সব মিলিয়ে আমার ছয়টি সমালোচনাগ্রন্থ রয়েছে।
প্রশ্ন: আপনি ‘পশ্চিমাদের ধর্মীয় চেতনা’ বলতে কী বোঝেন? আর সেই চেতনা কীভাবে কাফকার সৃষ্টিশীলতাকে সীমিত করেছিল?
কান শুয়ে: আমি মূলত ‘আদি পাপ’-এর ধারণার কথা বলছি। আদি পাপের ধারণা কাফকার ব্যক্তিগত জীবন এবং তার সৃষ্টিশীলতার পেছনে সব সময় কাজ করেছে। এ কারণেই কেউ কেউ তার লেখাকে অস্তিত্ববাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চান। আমি তাকে অস্তিত্ববাদ থেকে আলাদা করে দেখতে চাই। আমি কাফকার প্রাণবন্ত সৃষ্টিশীলতা, দৈনন্দিন পৃথিবীর প্রতি তার আকর্ষণ এবং তাকে দমিয়ে রাখা ধর্মীয় চেতনার বিরুদ্ধে তার পৌত্তলিক বিদ্রোহের কথা লিখি। তার ব্যক্তিত্ব ছিল শক্তিশালী। যুক্তির চাপে আটকে থাকা তার আদিম সৃষ্টিশক্তিকে তিনি লেখায় সামনে আনতে পেরেছিলেন।
কিন্তু বাস্তব জীবনে তিনি তার সৃষ্টির মতো শক্তিশালী ছিলেন না। তিনি সব সময় আদি পাপের ধারণায় নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কায় ছিলেন। দৈনন্দিন জীবনকে ভয় পেতেন এবং তা থেকে পালাতে চাইতেন। এখানে তিনি অস্তিত্ববাদের কাছাকাছি। ধর্মীয় চেতনা থেকে জন্ম নেওয়া অপরাধবোধ শেষ পর্যন্ত তার প্রাণশক্তিকে পরাজিত করেছিল। তার আত্মার ভেতরের ঘর্ষণ তার জীবনীশক্তিকে ক্ষয় করেছিল। তার চিঠি ও দিনলিপিতে তাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখা যায়, যিনি জীবনের সাধারণ, দৈনন্দিন বিষয়গুলো সহ্য করতে পারতেন না এবং প্রতিদিন ‘ভালো মানুষ’ হওয়ার চেষ্টা করতেন।
প্রশ্ন: আপনি নিজেকে উত্তর-আধুনিকতাবাদের বিরোধী এবং আধুনিকতাবাদী লেখক হিসেবে পরিচয় দেন। আপনার কাছে আধুনিকতাবাদ কী?
কান শুয়ে: উত্তর-আধুনিকতাবাদ কাঠামো ভেঙে দেয়, কিন্তু নতুন কিছু তৈরি করে না। তাই এটি সাহিত্য ও দর্শনের একটি অন্তর্বর্তী পর্যায় ছিল। সেই পর্যায় এখন শেষ হয়েছে। তখন যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা হয়েছিল, সেগুলো এখন আর আগের মতো প্রাসঙ্গিক নয়।
মানুষের চূড়ান্ত কাজ হলো সৃষ্টি করা এবং নির্মাণ করা। প্রকৃতির সন্তান হিসেবে প্রত্যেক মানুষের নিজের সৃষ্টিশক্তি ব্যবহার করা উচিত। প্রকৃতি মানুষের কাছে সেটিই প্রত্যাশা করে। এই দিক থেকে আধুনিকতাবাদ আমার কাছে উত্তর-আধুনিকতাবাদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিকতাবাদ আদর্শের দিকে এগোয়, সৃষ্টি ও উদ্ভাবনকে সবচেয়ে মূল্যবান মনে করে এবং দৈনন্দিন জীবনকে ভালোবাসে। ভবিষ্যতের আত্মিক জগৎ নির্মাণের জন্য এগুলো অপরিহার্য।
প্রশ্ন: অন্য শিল্পমাধ্যমের সমসাময়িক কোনো শিল্পী বা শিল্পকর্ম কি আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?
কান শুয়ে: সব আধুনিকতাবাদী শিল্প—সাহিত্যসহ—এক ধরনের পারফরম্যান্স। এগুলো শিল্পীর বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রকাশ। আমি অনেক ধরনের শিল্প পছন্দ করি। ধ্রুপদি সংগীত, আধুনিকতাবাদী চিত্রকলা এবং আধুনিক নৃত্য আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। বিজে, চাইকোভস্কি, বিথোভেন, ব্রাহ্মস, শুবার্ট, মেন্ডেলসন, বাখ—তাদের সংগীত আমার কাছে আধুনিকতাবাদী পারফরম্যান্সের প্রকৃত উদাহরণ। বাইবেল এবং ‘ডিভাইন কমেডি’-তেও আধুনিকতাবাদের শক্তিশালী উপাদান আছে। আমার কাছে এগুলো তথাকথিত উত্তর-আধুনিক সাহিত্যের চেয়েও শক্তিশালী। চিত্রশিল্পী ও ভাস্করদের মধ্যে ভ্যান গঘ, দালি, মুঙ্ক, মিরো, বোশ ও জিয়াকোমেত্তি আমার প্রিয়। আর আমার সবচেয়ে প্রিয় নৃত্য জাপানের বুটোহ—বিশেষ করে আনকোকু-বুটোহ আন্দোলন।
প্রশ্ন: আপনি আপনার লেখাকে ‘পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসের মাটিতে জন্ম নেওয়া একটি বিদেশি উদ্ভিদ’ বলেছেন। ‘বিদেশি উদ্ভিদ’-এর কথা আপনি প্রায়ই বলেন, কিন্তু ‘পাঁচ হাজার বছরের মাটি’ নিয়ে কম বলেন। চীনা সংস্কৃতির কোন অংশ আপনার লেখাকে প্রভাবিত করেছে?
কান শুয়ে: প্রথমে আমাদের জানতে হবে, চীনা সংস্কৃতি বলতে আমরা কী বুঝি। আমরা যে খাবার খাই, পোশাক পরি, একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক করি, প্রেম করি, ভাষা বিনিময় করি—এসব কি সংস্কৃতি? আমরা কি সত্যিই পাঁচ হাজার বছরের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করি? একজন সম্পূর্ণ আধুনিকতাবাদী শিল্পী হিসেবে কি সাধারণ মানুষের চেয়ে চীনা সংস্কৃতির প্রতি আমার অনুভূতি বেশি গভীর?
আপনি যে চীনা সাহিত্যগুলোর কথা বলেছেন, তার কিছু আমি পড়েছি। কিন্তু ‘ড্রিম অব দ্য রেড চেম্বার’ এবং কিছু তাং যুগের কবিতা ছাড়া সেগুলোর অধিকাংশ আমার আত্মাকে স্পর্শ করেনি। চীনা সংস্কৃতির যে গভীরতাকে আমি অনুসন্ধান করি, তার মধ্যে আছে ‘স্বর্গ ও মানুষের ঐক্য’-এর মতো ধারণার সম্ভাব্য শক্তি। গত পাঁচ হাজার বছরে আমরা এই শক্তি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলাম না। কারণ আমরা দীর্ঘদিন নিজেদের মধ্যে আবদ্ধ ছিলাম এবং স্বাধীনতার চেতনা দুর্বল ছিল।
কিন্তু এই শক্তি আমাদের মধ্যে থাকা উচিত। হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকা কোনো জাতির মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু চিরস্থায়ী উপাদান আছে। আপনি যদি সেগুলো বিকশিত না করেন, তাহলে সেগুলো অন্ধকারেই থেকে যাবে। কখনো আলো দেখবে না। অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে অস্তিত্বও লাভ করবে না। আমি পশ্চিমা সংস্কৃতিকে এক ধরনের কোদাল হিসেবে ব্যবহার করি। সেই কোদাল দিয়ে আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতির নিচে চাপা পড়ে থাকা শক্তিকে বের করে আনতে চাই।
পশ্চিমা সংস্কৃতি হাজার বছর ধরে নানা ভাগে বিভক্ত হয়েছে। আমি এখন দুই তীরকে—মাটি ও আকাশ, বস্তু ও অবস্তু—আবার একত্র করতে চাই। এই কাজে আমার একটি সুবিধা আছে— পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস থেকে পাওয়া পুষ্টি ও শিক্ষা।
প্রশ্ন: আপনার *মাইন্ড রিপোর্ট* বইয়ের ভূমিকায় আপনি পাঠকের ‘আত্মাকে মুক্ত করার’ কথা বলেছেন। আবার বলেছেন, শিল্পীর কাজ হলো পাঠককে নিজের ব্যক্তিগত নরকের দরজা খুলে দীর্ঘদিন বন্দী আত্মাকে মুক্ত করার সুযোগ দেওয়া। এই ধারণার সঙ্গে চীনের নিউ কালচার আন্দোলনের লেখকদের কিছুটা মিল আছে। লু স্যুনের ‘লোহার ঘর’-এর কথাও মনে পড়ে। আপনার কাজের সঙ্গে তাঁদের মিল ও অমিল কোথায়?**
কান শুয়ে: বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি লু স্যুনের মনোভাব এখনো আমার কাছে একটি আদর্শ। বিশ্বের দিকে খোলা থাকা, কিন্তু নিজের প্রতি হীনম্মন্য না হওয়া—চীনের মূল ভূখণ্ডের সাহিত্যিকদের মধ্যে এই মানসিকতার অভাব আছে। এই বিষয়ে আমি আগেও অনেক কথা বলেছি। শুধু এটুকু যোগ করতে চাই, আজকের মূল ভূখণ্ডের চীনা সাহিত্যিক পরিবেশ ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকের চেয়েও অনেক বেশি হতাশাজনক।
আমার কাজ হলো আজকের সাহিত্যিক পরিবেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, লু স্যুনের চেতনা এগিয়ে নেওয়া এবং তরুণ লেখকদের জন্য অন্তত সামান্য আশার জায়গা রেখে যাওয়া। আজকের সাহিত্যজগৎ কয়েকটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীতে বিভক্ত। তরুণ কোনো লেখক সামান্য সাহস দেখালেই তার সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রশ্ন: আপনি এমন এক চীনে বড় হয়েছেন, যে সময় দেশটি বাইরের পৃথিবী থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। ষাট ও সত্তরের দশকে আপনি বিদেশি সাহিত্য, মার্ক্সবাদী দর্শন ও পশ্চিমা ইতিহাস পড়েছেন। আপনার ‘ডানপন্থী’ হিসেবে নিপীড়িত বাবা-মাও আপনাকে উৎসাহ দিতেন। এত ভিন্ন প্রভাব আপনি লেখায় কীভাবে মিলিয়েছেন?
কান শুয়ে: আমি কখনো ধারণাকে ভিত্তি করে লিখি না। আমি অনুভূতিকে ভিত্তি করে লিখি। অবশ্যই আমার নিজস্ব ধারণা আছে। আমার চিন্তার ধরনকে আমি ‘যুক্তিবাদী অন্তর্দৃষ্টি’ বলতে পারি। কারণ আমার অনুভূতি শেষ পর্যন্ত যুক্তিতে পরিণত হয়। আমি আত্মার গভীরে থাকা দ্বন্দ্ব ও সংগ্রাম এবং শিল্পসচেতন মানুষের জীবনের ভূদৃশ্যকে তুলে ধরি। আমার শুরু হয় জীবনের তাগিদ থেকে—মনের গভীরে স্বাধীনতার যে আকাঙ্ক্ষা।

প্রথমে থাকে একটি তাগিদ। তারপর টানাপোড়েনের মধ্যে একটি ভূদৃশ্য তৈরি হয়। আপনি থেমে গেলে সেই ভূদৃশ্যও অদৃশ্য হয়ে যায়। বহু বছর ধরে পশ্চিমা চিন্তা পড়েছি এবং তা গভীরভাবে গ্রহণ করেছি। কিন্তু আমার সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া মূলত এক ধরনের চীনা বিদ্রোহী প্রক্রিয়া। অবশ্যই এর সঙ্গে আমার জীবনের পথও জড়িত। আমি এমন একজন চীনা মানুষ, যে পশ্চিমা সংস্কৃতিকে ভালোবাসে।
প্রশ্ন: ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন। এই সময়ে চীন বদলে গেছে, সাহিত্যবাজারও প্রায় পুরোপুরি বদলে গেছে। অথচ আপনার লেখার ধরন আশ্চর্যজনকভাবে একই রয়ে গেছে। আপনি নিজে কীভাবে দেখেন এই পরিবর্তনকে?
কান শুয়ে: গত কয়েক দশকে চীনা সাহিত্যজগতে যে ছোটখাটো পরিবর্তন ঘটেছে, কয়েক হাজার বছরের সাহিত্য ইতিহাসের তুলনায় সেগুলোর গুরুত্ব খুব সামান্য। এসব পরিবর্তন আমার লেখায় কোনো প্রভাব ফেলেনি। আমার লেখা ধীরে ধীরে বদলায়। আমার সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার নিজস্ব নিয়মই সেই পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে। এটি একটি বিবর্তন—ধীরে ধীরে নতুন জীবনের প্রকাশ। স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লেখা আমি একেবারেই অপছন্দ করি। চীনা সাহিত্যজগতের সঙ্গে আমি সব সময়ই এক ধরনের অসামঞ্জস্যের মধ্যে থেকেছি।
প্রশ্ন: আপনি মনে করেন, আপনার লেখা প্রত্যেক পাঠককে নিজের মতো করে অর্থ খুঁজে নিতে হবে। একই সঙ্গে আপনি নিজে অসংখ্য সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং পাঠকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। যদি পাঠের অর্থ খুঁজে নেওয়া এতটাই ব্যক্তিগত হয়, তাহলে সাক্ষাৎকার দেওয়ার প্রয়োজন কোথায়?**
কান শুয়ে: আমার লেখা এক বিশেষ ধরনের অগ্রসর সাহিত্য। এমনকি আমার মনে হয়, আমার সময়ের পাঠকদের কাছে আমার লেখা যতটা অগ্রসর, কাফকার সময়ের পাঠকদের কাছে কাফকার লেখাও হয়তো ততটা ছিল না। আমার নিজের বিশ্বাস, আমার মধ্যে যুক্তিবোধ ও মৌলিকত্ব—দুটিই অসাধারণভাবে শক্তিশালী। আমি বহু সমালোচনাগ্রন্থও লিখেছি।
উপন্যাস শেষ করার পর কিছুদিন বিরতি নিই। তারপর তার গভীর কাঠামোটি বুঝতে পারি। অন্য লেখকদের মধ্যে এই ক্ষমতা খুব কমই দেখা যায়। তাই আমি শুধু অন্য ক্লাসিক লেখকদের সমালোচনা করি না, নিজের শেষ করা উপন্যাস নিয়েও লিখি। লেখক নিজের উপন্যাসের সমালোচনা করতে পারেন না—এই ধারণা পুরোনো। আধুনিক সাহিত্যের বিকাশে নতুন ধরনের সাহিত্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়। একসময় তা দর্শনের সঙ্গে মিশে যায়। এমনকি এমন প্রভাবও তৈরি করতে পারে, যা দর্শন একা তৈরি করতে পারে না।
আমি একজন পরীক্ষামূলক ঔপন্যাসিক। আমার মধ্যে দার্শনিক প্রবণতা প্রবল। আমার পদ্ধতি হলো নিজের ওপর পরীক্ষা চালানো। তাই নিজের কাজ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও আমার আছে। এতে বিতর্কের কী আছে? প্রত্যেকেই তো নিজের ব্যাখ্যা দিতে পারে। আমি মনে করি, ভবিষ্যতের সব অগ্রগামী শিল্পী নিজেদের কাজের ব্যাখ্যাকারও হয়ে উঠবেন। এরপর নিজের কাজের ব্যাখ্যা করা একটি স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হবে।
প্রশ্ন: এটি কি পাঠকের জন্য ভালো খবর নয়?
কান শুয়ে: পাঠক যদি চোখ খোলা রাখেন, কৌতূহলী থাকেন, তাহলে তিনি যে লেখা পড়ছেন তার নিজের ব্যাখ্যা তৈরি করতে চাইবেন। এমনকি নিজের লেখা নিয়েও নতুনভাবে ভাববেন। তখন প্রতিটি লেখা হয়ে উঠবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার একটি ক্ষেত্র। ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে মানুষ আবার নতুন কিছু সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে।
আমি এই ধরনের ব্যাখ্যাকে বলি—‘লেখার সম্প্রসারণ’।
বাস্তববাদী পাঠের পদ্ধতি—দূরে দাঁড়িয়ে সাহিত্যকে মুগ্ধ হয়ে দেখা, রহস্যের সামনে কয়েকটি বিস্ময়সূচক বাক্য বলা—কান শুয়ের মতো পরীক্ষামূলক লেখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। প্রতিটি পাঠককে দাঁড়াতে হবে। তাকেও এক ধরনের পারফরম্যান্সে অংশ নিতে হবে। তবেই তিনি নিরিক্ষামূলক সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করতে পারবেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









