একসময় মসজিদের আঙিনায় ছিল মুসল্লিদের পদচারণা, নামাজের জন্য মানুষের আনাগোনা। ধর্মীয় আবহে মুখর থাকত চারপাশ। অথচ আজ সেই চেনা দৃশ্যের অনেকটাই হারিয়ে গেছে সুরমা নদীর বুকে। নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে মসজিদের অধিকাংশ অংশ। টিকে আছে সামান্য কিছু, যা নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের।
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা ইউনিয়নের রুস্তমপুর গ্রামে অবস্থিত রুস্তমপুর জামে মসজিদ। স্থানীয়ভাবে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো বলে পরিচিত এই মসজিদটি এখন অস্তিত্বের সংকটে। প্রায় দুই বছর আগে সুরমা নদীর ভাঙনে মসজিদের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে অবশিষ্ট অংশটুকু নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা—কত দিন আর টিকে থাকবে অতীতের এই স্মৃতিচিহ্ন? স্থানীয়দের কাছে মসজিদটি কেবল নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি এলাকার দীর্ঘদিনের ধর্মীয় জীবন ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নিদর্শন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মসজিদটিকে ঘিরে মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও বিশ্বাস গড়ে উঠেছে। কিন্তু সুরমার অব্যাহত ভাঙন সেই পরিচিত ইতিহাসের দৃশ্যমান অংশটুকুও কেড়ে নিয়েছে।
নদীভাঙন সুরমাপাড়ের মানুষের কাছে নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। ভাঙনের কবলে পড়ে অনেক সময় বসতভিটা, ফসলি জমি ও নানা স্থাপনা হারিয়ে যায়। তবে একটি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা বিলীন হওয়ার বেদনা ভিন্ন। এর সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে স্থানীয় ইতিহাসের এমন এক নিদর্শন, যা একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে আগের রূপে ফিরিয়ে আনা কঠিন। স্থানীয় বাসিন্দা ও মসজিদের ইমাম জসিম উদ্দিন পারভেস বলেন, মসজিদটি আমাদের এলাকার প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য। সুরমা নদীর ভাঙনে মসজিদের অধিকাংশ অংশ বিলীন হয়ে গেছে। এখন সামান্য অংশ অবশিষ্ট রয়েছে। মসজিদটির সঙ্গে এলাকার মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও ইতিহাস জড়িয়ে আছে। অবশিষ্ট অংশটুকুও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা চাই, মসজিদের এই অংশটুকু সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হোক।
মসজিদটির বয়স প্রায় পাঁচ শতাব্দী বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত থাকলেও এর নির্মাণকাল ও ইতিহাস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অবশিষ্ট স্থাপনাটির বর্তমান অবস্থা ও ঝুঁকি নিরূপণে বিশেষজ্ঞদের কারিগরি মূল্যায়ন জরুরি। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ঐতিহ্যটির শেষ চিহ্নটুকু রক্ষার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সুরমার স্রোতে রুস্তমপুর জামে মসজিদের অধিকাংশ অংশ হারিয়ে গেছে। এখন অবশিষ্ট সামান্য অংশ যেন অতীতের সঙ্গে বর্তমানের শেষ সংযোগ। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া না হলে এই অংশটুকুও নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে। তখন রুস্তমপুরের প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো বলে পরিচিত মসজিদটি হয়তো মানুষের স্মৃতি আর কথায় টিকে থাকবে, কিন্তু চোখের সামনে দেখার মতো কোনো চিহ্ন থাকবে না।
সুরমা নদী তার গতিপথে এগিয়ে চলেছে। আর নদীর পেটে হারিয়ে যেতে বসা রুস্তমপুর জামে মসজিদ নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে—ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আগে তাকে চেনা, তার ইতিহাস অনুসন্ধান করা এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া কতটা জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









