রূপকথার জাদু, ফ্র্যাঙ্ক ও’হারা, ডরিস লেসিং আর অ্যান কারসনের লেখার কাছে ফিরে যাওয়ার গল্প—কবি ও ঔপন্যাসিক রেবেকা পেরির পাঠজীবনের ভেতর দিয়ে।
প্রথম পাঠের স্মৃতি
আমার বয়স তখন পাঁচের কাছাকাছি। ভাইয়ের সঙ্গে যে ঘর ভাগ করে থাকতাম, তার মেঝেতে বসে পড়ছি স্পাইক মিলিগানের অন দ্য নিং ন্যাং নং। স্মৃতিতে দেখি, ভাইও আমার পাশে কার্পেটে বসে আছে। বই পড়ার স্মৃতি বোধ হয় এ রকমই—একটি বই, ঘরের মেঝে, আর এমন একজন মানুষ, যার উপস্থিতি হয়তো ঘটেছিল, হয়তো স্মৃতি তাকে সেখানে বসিয়ে রেখেছে।
শৈশবের প্রিয় বই
আমার কাছে ছিল রূপকথার একটি সংকলন। বড় হলুদ মলাটের বই। সাত থেকে দশ বছর বয়স পর্যন্ত বইটি আমাকে একরকম সম্মোহিত করে রেখেছিল।
আজও মনে পড়ে, ‘দ্য লিটল মারমেইড’ পড়তে গিয়ে সেই মুহূর্তের কথা—পাতা উল্টে দেখি, ছোট্ট মৎস্যকন্যাটি সমুদ্রের জলের ওপর ফেনা হয়ে গেছে। কী এক অসহায় হতাশা আমাকে গ্রাস করেছিল! পাঠক হিসেবে তখনই প্রথম বুঝেছিলাম, গল্পের পরিণতির সামনে আমাদের কোনো ক্ষমতা নেই। আমরা চাইতে পারি, কাঁদতে পারি, অন্য রকম সমাপ্তির স্বপ্ন দেখতে পারি; কিন্তু গল্প একবার নিজের ভাগ্য বেছে নিলে আমাদের ইচ্ছের আর তেমন মূল্য থাকে না।
বিশেষ করে ভালোবাসতাম স্কটিশ রূপকথা ‘দ্য ব্ল্যাক বুল অব নরওয়ে’। আমার মনে হয়, আমি যা কিছু লিখেছি, তার প্রায় সবকিছুর নিচে কোথাও না কোথাও এই গল্পটি লুকিয়ে আছে। লেখার মাটির নিচে যে শিকড় দেখা যায় না, কখনো কখনো তারাই গাছটিকে ধরে রাখে।
কৈশোরে যে বই আমাকে বদলে দিয়েছিল
ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা কালেক্টেড প্লেজ। স্কুলের জিসিএসই নাট্যশিক্ষার অংশ হিসেবে বইটি পড়েছিলাম। তারপর নিজে থেকেই খুঁজে বের করেছিলাম তার কবিতা। লোরকাকে বাদ দিয়ে আমার কৈশোরের পাঠ-অভিজ্ঞতা কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ভাষার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কল্পনা করা অসম্ভব। ‘সিটি দ্যাট ডাজ নট স্লিপ’ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি আমার মনে এমনভাবে আঘাত করেছিল, যেন হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলক এসে পড়েছে—
‘ভেঙে হৃদয় নিয়ে যে মানুষটি ছুটে বেরিয়ে যায়, রাস্তার মোড়ে তার দেখা হবে অবিশ্বাস্য এক কুমিরের সঙ্গে—নিঃশব্দে শুয়ে আছে সে, তারাদের কোমল প্রতিবাদের নিচে।’
কবিতার কাজ হয়তো এই— এমন একটি দৃশ্য সামনে আনা, যা আগে কখনো দেখিনি, অথচ দেখামাত্র মনে হয়, এত দিন ধরে যেন তারই অপেক্ষায় ছিলাম।
যে লেখক আমার ভাবনা বদলে দিয়েছিলেন
ফ্র্যাঙ্ক ও’হারা। জানি, একজন কবির মুখে এই নাম শোনা খুবই প্রত্যাশিত। কিন্তু তার যথেষ্ট কারণ আছে।

ও’হারাকে পড়ার আগে পর্যন্ত আমি যে কবিতাগুলো পড়েছি, সেগুলোকে মনে হতো গভীরভাবে গম্ভীর—যেন কবিতা এমন এক বস্তু, যাকে ছোঁয়ার আগে হাত ধুয়ে নিতে হয়। তার মধ্যে একটা দূরত্ব ছিল, প্রায় পবিত্রতার মতো। তারপর ও’হারাকে পড়লাম। মনে হলো, আচ্ছা, জীবন তো! কবিতার মধ্যে হঠাৎ দরজা খুলে গেল। বাইরের পৃথিবী—তার সাধারণতা, তুচ্ছতা, আনন্দ, আকস্মিকতা—সবকিছু ভেতরে ঢুকে পড়ল। সাহিত্যকে আর জীবন থেকে আলাদা কোনো গুরুগম্ভীর রাজ্য বলে মনে হলো না।
যে বই আমাকে লেখক হতে উৎসাহিত করেছে
সত্যি বলতে, কোনো একটি বই আমাকে লেখক হতে চাওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়নি। যত দূর মনে পড়ে, আমি সব সময়ই লিখেছি। পরে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের কোনো এক সময়ে বুঝলাম, সাধারণ জীবনের মানুষও চাইলে বই লিখতে পারে—যদি তার সুযোগ হয়, ভাগ্য সহায় হয়। তখন মনে হলো, আমিও একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি। তবে প্রশ্নটি যদি একটু বদলে নিই—কোন বই আমাকে মনে করিয়েছিল যে আমিও একটি উপন্যাস লিখতে পারি—তাহলে বলব, পার্সিভাল এভারেটের অসাধারণ ‘দ্য ট্রিজ’। বইটি পড়ার পর প্রথম মনে হয়েছিল, উপন্যাস লেখার সাহস হয়তো আমারও হতে পারে।
যে বইয়ে বারবার ফিরে যাই
অ্যান কারসনের ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’—বিশেষ করে ‘দ্য গ্লাস এসে’। বইটি প্রায় নিখুঁত। আমার মনের ভেতর সবকিছু যখন এলোমেলো হয়ে যায়, তখন এই লেখার কাছে ফিরে আসি। এক পৃষ্ঠার মধ্যেই এটি আমাকে মনে করিয়ে দিতে পারে, লেখার ক্ষমতা কত বিচিত্র, কত দূর বিস্তৃত হতে পারে। কিছু বই আমাদের নতুন কিছু শেখায়। কিছু বই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা আগে থেকেই কী জানতাম, অথচ ভুলে গিয়েছিলাম। কারসনের এই বই আমার কাছে দ্বিতীয় ধরনের। এক পৃষ্ঠা পড়ি, আর ভাষার সম্ভাবনা আবার নতুন করে অনুভব করি।
যে বই আর পড়তে পারব না
জে কে রাওলিংয়ের হ্যারি পটার সিরিজ আমার শৈশবের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল। কিন্তু কোনো কোনো শিল্পকর্মকে তার স্রষ্টার কাছ থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। এই ক্ষেত্রে আমি সেই বিচ্ছেদ ঘটাতে পারি না।
জীবনের পরে আবিষ্কার করা বই
ডরিস লেসিংয়ের ‘দ্য গোল্ডেন নোটবুক’ সম্ভবত তিরিশের কোঠায় পৌঁছানোর আগে পড়া হয়নি। কিন্তু বইটি আবিষ্কার করার জন্য আসলে কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। যেকোনো বয়সই এর কাছে পৌঁছানোর উপযুক্ত সময়।
এখন যে বইগুলো পড়ছি
অগাস্টিন সার্ফের ‘কমপেনসেশন’ বইটির প্রুফ কপি পড়ছি। যত দূর পড়েছি, অসাধারণ লাগছে। পাশাপাশি পড়ছি জামাইকা কিনকেইডের ‘মাই গার্ডেন’ (বুক)। অন্য কাজের ফাঁকে প্রায়ই বইটি তুলে নিই, এক-দুই পৃষ্ঠা পড়ি, তারপর আবার রেখে দিই। এ কে ব্লেকমোরের ‘ডুম পেইন্টিং’–ও নতুন করে পড়ছি। বইটি সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হওয়ার কথা। এটি এক বিস্ময়কর অর্জন। কীভাবে তিনি এমন একটি বই লিখলেন, তা আমি বুঝে উঠতে পারি না।
যে বই আমাকে সান্ত্বনা দেয়
গবোইগা ওদুবানজোর কবিতার বই অ্যাডাম। ২০২৩ সালে তার মৃত্যু হয়েছে। বইটি আমার ডেস্কের ঠিক ওপরের তাকটিতে রাখা থাকে। কখনো কখনো তার হারিয়ে যাওয়ার বেদনা যখন অসহনীয় মনে হয়, তখন বইটি নামিয়ে নিই। একটি কবিতা পড়ি। তারপর মনে পড়ে, তিনি এখনও সেখানে আছেন—পাতার মধ্যে। মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা বইয়ের নেই। একটি কবিতা কাউকে জীবিত করে তোলে না, মৃত্যুকে বাতিলও করে না। তবু শব্দের মধ্যে মানুষ নিজের জন্য একটি জায়গা রেখে যেতে পারে। আমরা সেখানে ফিরে যাই, একটি পৃষ্ঠা খুলি, কয়েকটি পঙ্ক্তি পড়ি। আর কিছুক্ষণের জন্য মনে হয়, অনুপস্থিতি মানেই সম্পূর্ণ অনুপস্থিত হয়ে যাওয়া নয়।
পাঠক আপনার জন্য রেবেকা পেরির ‘মে উই ফিড দ্য কিং’ থেকে একটি কবিতা
তুমি যদি কোনো কিছুকে ভালোবাসো
আমি যা করি, তার সবচেয়ে কঠিন দিকটি হলো এই—আর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে এর বাইরে আর কোনো অসুবিধা খুঁজে পাইনি—দৃশ্যগুলো যখন তৈরি হয়ে যায়, যখন নিখুঁত হয়ে ওঠে, তখন আমাকে মেনে নিতে হয়, সেগুলোর সঙ্গে মানুষ কীভাবে মিশবে, তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমার নেই।
কয়েকটি উদাহরণ দিই।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা জিনিসপত্র সরিয়ে এদিক-ওদিক করেন। কোনো দৃশ্য যদি দীর্ঘ সময় একই জায়গায় রাখতে হয়, তার সম্পূর্ণ পরিষ্কারের দায়িত্ব আমার, শুধু আমার। আমি আর আমার বিশেষ পোষাক। এ বিষয়ে আমার অবস্থান একেবারে স্পষ্ট। কিন্তু যাদের কাছে কথাটা পৌঁছানো দরকার, তাদের কাছে সচরাচর পৌঁছায় না। এ জন্য আমি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দোষ দিই না। আসলে মানুষ আমার অনুরোধকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে দেয় না। কিংবা ভাবে, আমি টের পাব না।
দর্শকেরা দড়ির বাধা পেরিয়ে আরও কাছ থেকে দেখতে চান। আমার তৈরি দৃশ্যগুলো একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব ও কোণ থেকে দেখার কথা ভেবে সাজানো হয়। যে দরজা, জানালা কিংবা দড়ির ঘেরাটোপের ওপার থেকে সেগুলো দেখা হবে, সেই অনুযায়ী তৈরি হয় দৃশ্যের বিন্যাস। অথচ কেউ যখন চুপিসারে ‘প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইন পেরিয়ে যান, দড়ির ক্লিপ খুলে ফেলেন কিংবা অন্য আলোয় গিয়ে দাঁড়ান, মুহূর্তেই ভেঙে যায় সমস্ত মায়া। নিজের জন্য আলাদা নিয়ম বানিয়ে নেওয়া মানুষটি কী ধরনের, তা থেকে অনেক কিছু বোঝা যায় বলে আমার বিশ্বাস। তবে সেটা অন্য প্রসঙ্গ।
ঐতিহাসিক পোশাক পরা অভিনেতারা দৃশ্যের সঙ্গে মিশে অভিনয় করেন। একবার দেখেছিলাম, এক ভাঁড় তিনটি ডালিমের প্রতিরূপ দিয়ে তার কসরত দেখাচ্ছেন। ফলগুলোর ওজন—অথবা ওজনের অভাব—তাঁকে চমকে দিয়েছিল। শুরুতেই একটি হাত ফসকে পড়ে গেল। রাজকীয় কাঠের মেঝেতে সেটি ফাঁপা শব্দ তুলে লাফিয়ে উঠল, তারপর গড়িয়ে ঢুকে গেল ভোজের টেবিলের নিচে। শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকল এক দর্শকের জুতোর ডগায়। ততক্ষণে তার চোখের সামনে ভেঙে গেছে মায়াটি।
এর চেয়েও খারাপ ছিল এক নির্লজ্জ রাজা। নিজের জীবনের এক সাধারণ দিনের বিবরণ দিতে দিতে তিনি এমন নাটকীয় বক্তৃতা শুরু করলেন যে মনে হলো, অভিনয়ের চেয়ে নিজের কণ্ঠস্বরের প্রেমেই তিনি বেশি মগ্ন। কথা বলতে বলতে মাংসের থালা থেকে একটি বড় মুরগির রান আলগা করে তুলে নিলেন। ছড়িয়ে পড়ল বাকি মাংসের টুকরোগুলো। তিনি রানটি উঁচু করে ধরে গর্জন করতে থাকলেন, বলতে থাকলেন, বলতে থাকলেন। তারপর যখন উপকরণটির সঙ্গে তার কাজ শেষ হলো, অত্যন্ত সাবধানে সেটি আবার টেবিলে রেখে দিলেন—উল্টো করে। এবার সবার সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়ল তার কৃত্রিম তলদেশ, সমতল নকলের সেই নিখুঁত ভান, আর প্রস্তুতকারকের লোগো।
এইভাবেই একটি দৃশ্যের মৃত্যু ঘটে। কোনো বড় বিপর্যয়ে নয়, বরং ছোট্ট একটি অসতর্কতায়। একটি ডালিমের ফাঁপা শব্দে, একটি জুতোর ডগায়, কিংবা মুরগির রানের তলায় লুকিয়ে থাকা প্রস্তুতকারকের নামটিতে।
ভালোবাসার কঠিন দিক বোধ হয় এই— তুমি যত্ন করে কিছু তৈরি করতে পারো, তার প্রতিটি খুঁটিনাটি নিখুঁত করে তুলতে পারো; কিন্তু একবার পৃথিবীর হাতে তুলে দিলে, তার পরিণতি আর তোমার হাতে থাকে না।
গার্ডিয়ান

পরিচিতি
রেবেকা পেরি ব্রিটিশ কবি ও ঔপন্যাসিক। ১৯৮৬ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া পেরি ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টারের সেন্টার ফর নিউ রাইটিং থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। তার কবিতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ সংকলন বিউটি/বিউটি প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে। বইটি মাইকেল মারফি মেমোরিয়াল পুরস্কার লাভ করে এবং টি এস এলিয়ট পুরস্কারসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পায়। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘স্টোন ফ্রুট’ প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় তার সৃজনশীল গদ্যগ্রন্থ ‘অন ট্র্যাম্পোলিনিং’। ২০২৬ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘মে উই ফিড দ্য কিং’ ওয়াটারস্টোনস ডেব্যু ফিকশন পুরস্কার জেতে এবং বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায় স্থান পায়। শৈশবের রূপকথা, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার কবিতা, ফ্র্যাঙ্ক ও’হারা এবং অ্যান কারসনের লেখা তার সাহিত্যভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বর্তমানে তিনি লন্ডনে বসবাস করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









