প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বরিশাল নগরীর ঐতিহ্যবাহী সরকারি বরিশাল কলেজের একটি পুকুর রাতের আঁধারে ভরাট করার অভিযোগ উঠেছে কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্রাবাস নির্মাণের অজুহাতে কলেজ সংলগ্ন প্রায় ৩০ শতাংশের এই জলাশয়টিতে বালু ফেলার কাজ শুরু হয়েছিল। তবে অভিযোগ পেয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপে রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে ভরাট কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয় কলেজ প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিনে জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই ট্রাকে করে বালু এনে অত্যন্ত গোপনে পুকুরটির দক্ষিণ অংশ থেকে ভরাট শুরু করা হয়। রাতের মধ্যেই প্রায় ৩০ শতাংশ আয়তনের জলাশয়টির এক-তৃতীয়াংশ এলাকা বালু দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম টিপুর সহায়তায় কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. মহিউদ্দিন এই ভরাট কাজ তদারকি করছিলেন।
পরিবেশ আইন অনুযায়ী, ২০০০ সালের প্রাকৃতি জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুসারে যেকোনো মহানগরী এলাকায় পুকুর, দিঘি বা জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন ও ভরাট করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-র বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক লিংকন বায়েন তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, বরিশাল কলেজের এই পুকুরটি বহু ঐতিহাসিক স্মৃতির ধারক এবং এটি একসময় স্থানীয়দের মূল পানির উৎস ছিল। সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কীভাবে আইন লঙ্ঘন করে এভাবে পুকুর ভরাট করতে পারেন? এটি পরিবেশ আইনের চরম লঙ্ঘন। আমরা ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানিয়েছি, প্রয়োজনে এর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি লড়াই চালানো হবে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) উচ্ছেদ শাখার প্রধান মো. লকিতুল্লাহ শিকদার জানান, বিসিসি প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের নির্দেশে রোববার তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ভরাট কাজ বন্ধ করে দেন। তিনি বলেন, আইন অমান্য করে শ্রেণি পরিবর্তন বা পুকুর ভরাট করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে অধ্যক্ষ কোনোভাবেই আইনি বিধি ডিঙিয়ে এটি করতে পারেন না।
এদিকে অভিযোগ স্বীকার করে সরকারি বরিশাল কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. মহিউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রাবাস করার উদ্দেশ্যে কলেজের গঠিত ৩ সদস্যের কমিটির মাধ্যমে কাজ শুরু হয়েছিল। তবে বিসিসি ও সংশ্লিষ্টদের আপত্তি ও বাধা পাওয়ায় আমরা ভরাট কাজ বন্ধ রেখেছি, আর ভরাট করব না।
পুকুরটি ভরাটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম টিপুও। তবে বিসিসি'র হস্তক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পুকুরটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত ডোবা হিসেবে ছিল। মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে ছাত্রাবাস নির্মাণের জন্যই কলেজ কর্তৃপক্ষ বালু ফেলছিল। এটি কলেজের নিজস্ব জায়গা, সিটি করপোরেশন কীভাবে একটি কলেজের উন্নয়নকাজ বন্ধ করে?
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল জেলা সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দিন জানান, খবর পাওয়ার পর রোববার সকালে সরেজমিনে তদন্ত করে পুকুর ভরাটের সত্যতা পাওয়া গেছে। দ্রুতই কলেজ কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হবে।
ঐতিহ্যবাহী এই জলাশয়টি এখনও সংস্কার ও সংরক্ষণ করে শহরের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করছেন পরিবেশবাদী ও সাধারণ নাগরিকরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









