জীবনের তাগিদে পেশাগত দায়িত্ব আর একটু আনন্দময় মুহূর্তের খোঁজে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে গিয়েছিলেন তারা। উদ্দেশ্য ছিল অসুস্থ স্ত্রীর একটু মন ভালো করা এবং পরিবারের সবাইকে নিয়ে কিছু সুন্দর মুহূর্ত কাটানো। কিন্তু কে জানত, সেই আনন্দভ্রমণই এক পলকে কেড়ে নেবে পুরো একটি পরিবারের বেঁচে থাকার সব অবলম্বন?
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন "টুপটুপ রিসোর্ট''-এ সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাসহ পরিবারের ছয় সদস্যকে চিরতরে হারিয়েছেন বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা নূর আলম। শুধু অফিসের জরুরি কাজে একদিন আগে কর্মস্থলে ফিরে আসায় অলৌকিকভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও এখন তিনি পুরোপুরি বাকরুদ্ধ।
নূর আলম বেসরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত। চাকরির সুবাদে প্রায় আট বছর ধরে তিনি স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছেন। তার পৈতৃক বাড়ি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়াকোঠা ইউনিয়নের গাজিরপাড় গ্রামে। তবে তার শ্বশুরবাড়ি পটুয়াখালীর তালতলীতে হলেও পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার বনশ্রী এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছিল।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩) বেশ কিছুদিন ধরে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থতার মাঝেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিছু আনন্দঘন সময় কাটাতে তারা কক্সবাজার ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) স্ত্রী ফারিয়া কবির এবং পাঁচ বছরের একমাত্র ছেলে ফাইজান নূরকে সঙ্গে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান নূর আলম। পরদিন বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তারা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর হঠাৎ অফিসের জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নূর আলম একাই চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। নিয়তির কি নির্মম পরিহাস! পরের দিন শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর দেখে তিনি দ্রুত স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। খবর আসে, ওই ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তার পুরো পৃথিবী।
শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টটিতে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ চেষ্টার পর ঘটনাস্থল থেকে মোট ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত নূর আলমের পরিবারের ছয় সদস্য হলেন নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), তাঁদের একমাত্র সন্তান পাঁচ বছর বয়সী ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)।
এছাড়া এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে আরও কয়েকজন দগ্ধ হয়ে বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দগ্ধদের মধ্যে নিহত ফারিয়া কবিরের মামা ইসমাইল হোসেন ও মামি মেহেরুন নেছাও রয়েছেন। তাদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে।
নূর আলমের বাবা মোহাম্মদ আলী রাঢ়ী জানান, ছেলে নূর আলম বিয়ে করার পর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কখনো তাদের গ্রামের বাড়িতে আসেননি। পুত্রবধূ, নাতি এবং ছেলের শ্যালক-শ্যালিকাসহ একবারে পরিবারের ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার এই বেদনা তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সবার মরদেহ ঢাকায় দাফন করা হবে।
এদিকে একসাথে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়ে নূর আলম এখন পুরোপুরি বাকরুদ্ধ। কারো সঙ্গে কোনো কথাই বলছেন না। পরিবারের প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে তোলা শেষ হাসিমুখের ছবিগুলোই এখন তার জীবনের একমাত্র সম্বল ও অন্তহীন কান্নার খোরাক।
যে ভ্রমণ ছিল পরিবারের সাথে এক চিল্লে আনন্দ পাওয়ার আয়োজন, সেটিই আজ নূর আলমের জীবনে হয়ে রইল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও অপূরণীয় ক্ষত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









