এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে মন্দির। মাঝখানে ব্যবধান মাত্র ১০ ফুট। দুটি উপাসনালয়ের প্রবেশদ্বার যেন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ভেসে আসে আজানের গম্ভীর সুর, অন্যদিকে পূর্ণ ভক্তিতে চলে পূজার্চনা। অথচ নেই কোনো মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ, নেই কোনো সাম্প্রদায়িক বিভেদ। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সার্বিক সহযোগিতার সুদৃঢ় বন্ধনে দীর্ঘ অর্ধশতক ধরে পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের মানুষের ধর্মীয় উপাসনা।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে যখন ঢাকের বাদ্য বাজে, তখন ভালোবেসে মসজিদের সীমানাপ্রাচীর রং করে দেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা। আবার পবিত্র ঈদ এলে একইভাবে মন্দিরের সীমানাপ্রাচীর রং করে দেওয়ার দায়িত্ব নেন মুসলিম যুবকেরা। অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পরম সহাবস্থানের এমন অভাবনীয় ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া বাজার এলাকার ‘কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদ’ ও ‘কামাইছড়া দুর্গামন্দির’।
ঢাকা-সিলেট পুরোনো মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এ দুটি উপাসনালয়কে ঘিরে যুগ যুগ ধরে বিরাজ করছে সম্প্রীতির এক স্নিগ্ধ পরিবেশ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কামাইছড়া দুর্গামন্দির। এর ঠিক ১৯ বছর পর, ১৯৭৮ সালে স্থানীয় মুসলিম ও চা বাগান শ্রমিকদের সুবিধার্থে মন্দিরের মুখোমুখি মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে গড়ে ওঠে কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদ। বর্তমানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই উপাসনালয় কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়; বরং তা দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পরম সহনশীলতা ও সামাজিক আস্থার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শত কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও আযান ও সালাতের সময় উপাসনালয় দুটির সদস্যরা অত্যন্ত সচেতন থাকেন। দুর্গাপূজার উৎসব চলাকালে আজান ও নামাজের সময় পূজা উদযাপন কমিটি সাময়িকভাবে ঢাক-ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখেন। নামাজ শেষ হলে পুনরায় ধর্মীয় আচার শুরু হয়। একইভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরাও পূজার ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করতে পূর্ণ সহায়তা প্রদান করেন।
কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুর রহিম অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের মসজিদ ও মন্দিরটি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে আমরা দুই কমিটির দায়িত্বশীলরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কোনো রকম বিভ্রান্তি ছাড়াই ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। এখানে কোনো দিন সামান্য বিরোধও সৃষ্টি হয়নি। কামাইছড়ার এই সৌহার্দ্যের চিত্র পুরো দেশের মানুষের জন্য অনুকরণীয় হওয়া উচিত।"
একই সুরে সুর মিলিয়ে কামাইছড়া দুর্গামন্দিরের পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি গোপাল গোয়ালা বলেন, "আমরা হিন্দু-মুসলিম সব সময় এক পরিবারের মতো মিলেমিশে থাকি। আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। একে অপরের উৎসবকে সম্মান করি। ঈদের সময় তারা আমাদের মন্দিরের প্রাচীর ধুয়ে-মুছে রং করে দেয়, আর পূজায় আমরা মসজিদের দেয়াল সুন্দর করে রং করে দিই। আশা করি, যুগ যুগ ধরে আমাদের এই সম্প্রীতির সম্পর্ক অটুট থাকবে।"
এ বিষয়ে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, "কামাইছড়ায় দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি অবস্থান করে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য ইতিহাস তৈরি করেছে। একদিকে মুসলমানরা সালাত আদায় করছেন, অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা করছেন। এটি হাজার বছরের আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাস্তব প্রতিফলন। বাহুবল তথা সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এটি এক অনন্য শিক্ষা।"
কামাইছড়া পুলিশ ক্যাম্পের এএসআই মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে পুলিশকে আলাদা কোনো বেগ পেতে হয় না। স্থানীয় মানুষের নিজস্ব সামাজিক অনুশাসন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই সব জটিলতা এড়িয়ে শান্তিময় পরিবেশ বজায় রাখে।
সাম্প্রতিক সময়ে নানা সামাজিক প্রেক্ষাপটে যখন সহনশীলতার চর্চা নিয়ে আলোচনা চলে, তখন বাহুবলের কামাইছড়ার এই চিরচেনা চিত্রটি গোটা জাতিকে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক সুস্পষ্ট ও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









