একদিন যে শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিন তার কণ্ঠ শোনা যেত, একদিন সেই শ্রেণিকক্ষেই তার অনুপস্থিতি অনুভূত হবে। হয়তো কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ মনে করবে, স্যার এভাবে বুঝিয়ে দিতেন। কোনো সহকর্মীর মনে পড়বে তার সঙ্গে কাটানো দিনের কথা। সময় এগিয়ে যাবে, বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজবে আগের মতোই। শুধু সেখানে আর নিয়মিত দেখা যাবে না প্রধান শিক্ষক মো. ফজলুর রহমানকে।
ভোলা সদর উপজেলার চরসামাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরে গেছেন। ১৪ অক্টোবর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তার বিদায়ী সংবর্ধনা ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গুণীজনদের উপস্থিতিতে দিনটি হয়ে ওঠে স্মৃতি আর আবেগে ভরা। একজন শিক্ষককে বিদায় জানাতে গিয়ে যেন ফিরে দেখা হয় অনেকগুলো বছর—কত মুখ, কত শ্রেণিকক্ষ, কত পরিচিত সকাল আর কত অসমাপ্ত গল্প।
শিক্ষকতা এমন এক পেশা, যার কাজের হিসাব শুধু খাতায় লেখা থাকে না। একজন শিক্ষক কতজন শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছেন, তার সংখ্যা হয়তো বের করা যায়। কিন্তু তার কাছ থেকে কতজন সাহস পেয়েছে, কতজন নিজের ভুল শুধরে নিয়েছে, কিংবা কতজন জীবনের কঠিন সময়ে তার বলা কোনো কথা মনে করেছে—তার হিসাব রাখা কঠিন। ফজলুর রহমানের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনও তাই শুধু চাকরির মেয়াদ দিয়ে বোঝার নয়।
শ্রেণিকক্ষ থেকে শ্রেণিকক্ষে
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার আগেই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন ফজলুর রহমান। ভোলা সদরের ঐতিহ্যবাহী চরনোয়াবাদ মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন তিনি। পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন।
চর রমেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরকালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুরাদ ছবুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ব্যাংকের হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন তিনি। একেকটি বিদ্যালয় তার জীবনের একেকটি অধ্যায়। সেসব জায়গায় রেখে এসেছেন সময়, শ্রম ও অভিজ্ঞতা। আর শিক্ষার্থীদের জীবনে থেকে গেছে তার পাঠদানের স্মৃতি।
শিক্ষকতার দিনগুলোতে প্রতিদিন হয়তো একই রকম মনে হয়েছে—সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়া, শিক্ষার্থীদের পড়ানো, সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করা, নানা দায়িত্ব সামলানো। অথচ দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলে বোঝা যায়, এই সাধারণ দিনগুলোর মধ্যেই জমা হয় জীবনের বড় অংশ। তখন একটি পুরোনো শ্রেণিকক্ষ, একটি পরিচিত মুখ কিংবা শিক্ষার্থীর বলা ছোট্ট কোনো কথা হয়ে ওঠে অমূল্য স্মৃতি।
অর্জনের পাশে দায়িত্বের গল্প
কর্মজীবনে নিষ্ঠা ও দক্ষতার স্বীকৃতিও পেয়েছেন ফজলুর রহমান। ২০১১ সালে তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত হন। ২০১৬ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ মনোনয়নে থাইল্যান্ড সফরের সুযোগ পান। সেখানে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তার পেশাগত জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তবে একজন শিক্ষকের জীবনে পুরস্কারের গুরুত্ব যতই থাকুক, তার কাজের সবচেয়ে বড় মূল্য হয়তো অন্য কোথাও। বহু বছর পর কোনো শিক্ষার্থী যখন নিজের জীবনের সাফল্যের কথা মনে করে, তখন তার মনে পড়ে যেতে পারে সেই মানুষটির কথা, যিনি একসময় তাকে শিখিয়েছিলেন, বুঝিয়েছিলেন কিংবা ভুল করার পরও নতুন করে চেষ্টা করতে বলেছিলেন।
বিদায়ী অনুষ্ঠানে সহকর্মীরা ফজলুর রহমানকে শুধু একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক হিসেবেও স্মরণ করেন। তাদের কথায় উঠে আসে তার দায়িত্ববোধ, নিষ্ঠা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণের কথা।
যে পরিবারে শিক্ষাও ছিল জীবনের অংশ
ফজলুর রহমান ভোলা সদরের চৌমুহনীর ঐতিহ্যবাহী সেকান্দার আলী হাজী বাড়ির মরহুম নুরুল হক হাওলাদার ও মরহুমা আনোয়ারা বেগমের সন্তান। তার নিজের সংসারেও শিক্ষার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। স্ত্রী মোহসেন আরা বেগম ছিলেন একজন শিক্ষক। জেলা সদরের পশ্চিম রুহিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনিও সম্প্রতি অবসরে গেছেন।
তাদের চার সন্তানই উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। জ্যেষ্ঠ সন্তান মো. আসাদুজ্জামান দৈনিক ‘উত্তরদক্ষিণ’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্য দুই ছেলে ও এক মেয়েও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।
একটি পরিবারে বাবা-মা দুজনই শিক্ষক হলে শিক্ষা শুধু তাদের পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রতিদিনের জীবনযাপনের অংশ। দায়িত্ব, নিয়ম, অধ্যবসায় আর মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার মতো বিষয়গুলো তখন ঘরের পরিবেশেও জায়গা করে নেয়। ফজলুর রহমান ও তার স্ত্রীর জীবনেও শিক্ষকতার সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা জড়িয়ে রয়েছে।

শেষ ঘণ্টার পরও
বিদায়ী অনুষ্ঠানে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ অতিথিরা বক্তব্য দেন। তারা ফজলুর রহমানের কর্মজীবনের কথা স্মরণ করেন এবং তার অবসরজীবনের মঙ্গল কামনা করেন। শেষে তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
অবসরের পর তার সকালগুলো হয়তো বদলে যাবে। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার তাড়া থাকবে না। শ্রেণিকক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মুখ দেখার অভ্যাসও ধীরে ধীরে অন্য রূপ নেবে। দীর্ঘদিনের পরিচিত দায়িত্ব থেকে সরে আসার মধ্যে একধরনের শূন্যতা থাকে। যে কাজকে ঘিরে দিনের পর দিন জীবন সাজানো হয়েছে, তা থেকে দূরে দাঁড়ালে পেছনের দিনগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু শিক্ষকতার জীবন কি সত্যিই অবসরে শেষ হয়? বিদ্যালয়ের নথিতে হয়তো তার কর্মজীবনের সমাপ্তি লেখা থাকবে। তবু কোথাও কোনো শিক্ষার্থী তার শেখানো কথা মনে রাখবে, কোনো সহকর্মী পুরোনো দিনের গল্পে তার নাম তুলবেন, কোনো পরিচিত মানুষ তাকে দেখে বলবেন—আপনার কাছে একসময় পড়েছিলাম।
সেই মুহূর্তগুলোতেই শিক্ষকতার আরেকটি জীবন শুরু হয়—যে জীবনের জন্য বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা জরুরি নয়, অবসরের কাগজও তার শেষ কথা নয়।
মো. ফজলুর রহমান এখন অবসরজীবনে প্রবেশ করেছেন। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের দরজা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু তার স্মৃতির দরজা খোলা থাকবে অনেকের মনে। কারণ, একজন শিক্ষক শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পাঠ দেন না; কখনো কখনো তাঁর শেখানো কথা মানুষের সঙ্গে থেকে যায় সারা জীবন।
বিদ্যালয়ের ঘণ্টা আবার বাজবে। নতুন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করবেন, নতুন শিক্ষার্থীরা বেঞ্চে বসবে। আর সময়ের সেই চলমান স্রোতের মধ্যে কোথাও থেকে যাবেন ফজলুর রহমান—একজন শিক্ষক হিসেবে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে অন্যদের জীবনে জ্ঞানের আলো পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









