‘এটি আমাদের বন, আমাদের গর্ব। এই বন থেকে আমরা নানা ধরনের উপকার পাই। সিংড়া বন রক্ষার দায়িত্ব দূর থেকে এসে কেউ পালন করে দিয়ে যাবে না। আমাদের নিজেদেরই এগিয়ে এসে নিজেদের বন রক্ষা করতে হবে।’
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে সিংড়া জাতীয় উদ্যান ও শালবন রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে এ কথাগুলো বলেন ভোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য মোছা. নুরুন্নেসা। ডালা গ্রামে আয়োজিত একটি সচেতনতামূলক সভায় তাঁর এই বক্তব্য যেন বন রক্ষায় স্থানীয় মানুষের দায়িত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
সিংড়া শালবন শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়, এটি এলাকার প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। এই বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত বীরগঞ্জ উপজেলার চাউলিয়া, ডালা, সিংড়া ও নন্দগাঁও গ্রামে আটটি সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ অংশ নেন।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির অর্থায়নে পরিচালিত ‘কম্প্রিহেন্সিভ নেচার লার্নিং টু অ্যাক্টিভেট স্কুল চিলড্রেন’ প্রকল্পের উদ্যোগে সভাগুলোর আয়োজন করা হয়। এতে সিংড়া জাতীয় উদ্যানবিষয়ক তথ্যচিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রকৃতি সংরক্ষণ নিয়ে উপস্থাপনা করা হয়। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার গুরুত্ব, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষের ভূমিকা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
সভাগুলোতে চাউলিয়া মিশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নন্দগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সিংড়া আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়। প্রকল্পের আওতায় প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে তারা যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা অন্যদের সামনে তুলে ধরে। সভা শেষে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার শপথ নেন অংশগ্রহণকারীরা।

সিংড়া গ্রামের বাসিন্দা চুন্দা টুডু মনে করেন, বন রক্ষায় মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনা জরুরি। তার ভাষ্য, বনের চারাগাছ তুলে নেওয়া এবং বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। এ জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বনের অতীতের স্মৃতি তুলে ধরেন চাউলিয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আবুল কাশেম। একসময় সিংড়া বনে ফরেস্ট গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আবুল কাশেম বলেন, আগে বনটি আরও বড় ছিল। স্থানীয় মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গাছপালার ক্ষতি হয়েছে। বন রক্ষায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
শুধু সচেতনতামূলক সভা নয়, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশবিষয়ক জ্ঞান ও প্রকৃতি সংরক্ষণের আগ্রহ তৈরিও প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য। ২০২৫ সালের ১৫ জুন শুরু হওয়া ২১ মাস মেয়াদি প্রকল্পটির আওতায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সিংড়া জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরিবেশবিষয়ক পাঠদান ও মাঠপর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।
শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রবীণ বাসিন্দা—সবার অংশগ্রহণে এই উদ্যোগের মূল বার্তা একটাই: বন রক্ষার দায়িত্ব স্থানীয় মানুষেরও। সিংড়া শালবনের গাছপালা, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ ও দায়িত্বশীল আচরণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









