পড়াশোনার কোনো বয়স নেই—ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ় মনোবল থাকলে প্রতিকূলতা জয় করে স্বপ্ন পূরণ করা যায়। এ কথারই বাস্তব উদাহরণ নরসিংদীর রায়পুরার গৃহিণী আফরোজা আক্তার মেরী। দুই সন্তানের মা, সংসারের নানা দায়িত্ব আর সামাজিক বাধা পেরিয়ে দীর্ঘ ১৯ বছর পর আবার বই হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.১৯ পেয়ে অর্জন করেছেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলে জানা যায়, মেরী রায়পুরার দৌলতকান্দি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মানবসম্পদ উন্নয়ন শাখা থেকে এ ফল অর্জন করেন। তার এ সাফল্যে আনন্দিত পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।
আফরোজা আক্তার মেরী নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মরজাল ইউনিয়নের কুমারটেক গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামী ইমরুল হাসান বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। দুই সন্তানের সংসার সামলানোর পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাই তাকে পৌঁছে দিয়েছে এই সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে।
২০০৭ সালে বিয়ের সময় মেরী দৌলতকান্দি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। সামনে ছিল এসএসসি পরীক্ষা। কিন্তু হঠাৎ বিয়ে হয়ে যাওয়ায় থেমে যায় তার পড়াশোনা। সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে থেকেও মনের ভেতর শিক্ষাজীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষা রয়ে যায়।
বিয়ের পর বড় ছেলের জন্মের তিন বছর পর, ২০১২ সালে আবার পড়াশোনা শুরুর চেষ্টা করেন তিনি। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হলেও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, পাড়া-প্রতিবেশী ও বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কটূক্তি এবং বয়স নিয়ে নানা মন্তব্যের কারণে সে চেষ্টা সফল হয়নি। এরপর সংসার ও দুই সন্তানের লালন-পালনেই মনোযোগ দেন তিনি।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৩ সালে আবার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার কথা স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের জানান মেরী। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া হলেও নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবেই পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বামীর উৎসাহে আগের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দৌলতকান্দি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন।
শুরু হয় নতুন করে পথচলা। দিনের বেলায় সংসারের কাজ, দুই সন্তানের দেখাশোনা—সব দায়িত্ব শেষ করে রাত ১২টার পর বই নিয়ে বসতেন তিনি। তার এ যাত্রায় সবচেয়ে বড় সহায় ছিলেন স্বামী ইমরুল হাসান। স্ত্রীকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করতে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন তাঁর প্রাইভেট শিক্ষক।
নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হলেও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারেননি মেরী। তবে শিক্ষকদের সহযোগিতা ও নিজের অধ্যবসায়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যান। অবশেষে ২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.৫৫ অর্জন করেন। এ সাফল্য তাকে নতুন করে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। এরপর একই প্রতিষ্ঠানে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন।
উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও সহজ ছিল না তার পথচলা। বড় ছেলের এসএসসি পরীক্ষা, ছোট ছেলের বিদ্যালয়ের নানা ব্যস্ততা এবং নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে বারবার বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। তবু দমে যাননি। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। সব বাধা পেরিয়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.১৯ অর্জন করেন তিনি।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর শিক্ষাজীবনে ফিরে এসে ধারাবাহিকভাবে এসএসসি ও এইচএসসিতে সাফল্য অর্জন করায় মেরী ও তার পরিবার এখন আনন্দিত। তার এ অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য ও পরিশ্রম থাকলে বয়স কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা স্বপ্নপূরণের পথে চূড়ান্ত বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
মেরীর স্বামী ইমরুল হাসান বলেন, ‘তুমি প্রমাণ করে দিলে, মানুষের ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য আর পরিশ্রমের বিকল্প কিছু নেই। আজ আমি ও আমার পরিবার খুবই আনন্দিত। ১৯ বছর পর এসেও তুমি সফল হয়েছ। তুমি তোমার সর্বোচ্চটা দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাও। আমি তোমার পাশে আছি, তোমার প্রাইভেট টিচার হয়ে।’
আফরোজা আক্তার মেরীর এ সাফল্য তাদের জন্য অনুপ্রেরণা, যারা সংসার, সন্তান কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিজের স্বপ্ন থেকে দূরে সরে গেছেন। তার গল্প মনে করিয়ে দেয়, স্বপ্ন পূরণের জন্য নতুন করে শুরু করার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









