বরগুনার আমতলীসহ উপকূলীয় এলাকায় শীত মৌসুম এলেই আগের মতো অতিথি পাখির কোলাহল আর চোখে পড়ে না। এক সময় শীতের শুরুতে পায়রা, বিষখালী ও আন্দারমানিক নদী বেষ্টিত চরাঞ্চলগুলো নানা প্রজাতির অতিথি পাখির কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে উঠত। এখন সেখানে সেই চিত্র অনেকটাই ম্লান।
স্থানীয় সূত্র ও পাখি পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে এ অঞ্চলে আগত অতিথি পাখির সংখ্যা ছিল শতাধিক প্রজাতির। বর্তমানে তা কমে মাত্র ২০ থেকে ৩০ প্রজাতিতে এসে ঠেকেছে। প্রতিবছরই শীত মৌসুমে কিছু অতিথি পাখি এলেও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
পাখি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আমতলী ও আশপাশের চরাঞ্চলগুলোতে অতিথি পাখির কলতান শোনা দুষ্কর হয়ে পড়বে।
পাখি পর্যবেক্ষকদের মতে, অতিথি পাখি কমে যাওয়ার পেছনে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় কারণ। পাশাপাশি কৃষি ব্যবস্থায় পরিবর্তনও পাখিদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে ফসলে প্রধানত জৈব সার ব্যবহার করা হতো, বর্তমানে সেখানে ব্যাপকভাবে বিষাক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব রাসায়নিক খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে পাখিদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।
এ ছাড়া এক শ্রেণির অসাধু শিকারি বিষ দিয়ে পাখি নিধন করে প্রকাশ্যেই বাজারে বিক্রি করছে। এতে করে পাখিরা এ অঞ্চলকে নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে আর বিবেচনা করছে না। ফলে তারা বিকল্প নিরাপদ স্থানের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
উপকূলীয় পায়রা, বিষখালী ও আন্দারমানিক নদীঘেঁষা চরাঞ্চলের গাছের সবুজ বেষ্টনিও দিন দিন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকাশ্যেই বনের গাছ লুটপাট ও কাটা হচ্ছে। এতে করে পাখিদের আশ্রয় ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে, যা তাদের সংখ্যা হ্রাসের আরেকটি বড় কারণ।
নদীগুলোতে অবাধে কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ শিকারের বিষয়টিও পাখিদের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে একদিকে পাখিদের খাদ্যোপযোগী মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে জালে জড়িয়ে অনেক পাখিও প্রাণ হারাচ্ছে।
এ বিষয়ে আমতলী উপজেলা বনবিভাগীয় কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন,“শীত মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় আসা অতিথি পাখির বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় বন বিভাগ সব ধরনের সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। অবৈধ গাছ কাটা ও পাখি নিধনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”
সচেতন মহলের মতে, অতিথি পাখি রক্ষায় শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। আবাসস্থল সংরক্ষণ, রাসায়নিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ শিকার বন্ধ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো না গেলে উপকূলীয় প্রকৃতি তার চিরচেনা পাখির কলতান হারাবে-এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









