গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের বেকাসহারা গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় শতবর্ষী শ্রী শ্রী কৃষ্ণ চন্দ্র জিউর মন্দির। সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকা এই প্রাচীন মন্দিরটি শুধু এক ধর্মীয় উপাসনালয় নয় স্থানীয়দের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতিক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
দীর্ঘদিন সংস্কার ও তদারকির অভাবে মন্দিরটি আজ ভগ্নদশায়। দেয়ালের একাধিক স্থানে রং উঠে গেছে, দেয়াল ফেটে ভেঙ্গে পড়ছে, কাঠের দরজা জানালাও নষ্ট হয়ে পড়ে যাচ্ছে। একসময় পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ঘেরা এই মন্দির চত্বর এখন আগাছায় ভরপুর এবং অবহেলার চিহ্নে ঢেকে আছে।
স্থানীয় প্রবীনেরা জানান, প্রায় সাড়ে তিন একর জমির উপর ১৯২৯ সালে দানবীর প্রসন্ন কুমার বসু মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকান্ডর গুরুত্ব বিবেচনায় তিনি শ্রীপুর অঞ্চলের বিভিন্ন মৌজা থেকে জমি ও বাড়িঘর কিনে মন্দিরের নামে রেজিষ্ট্রি করে দেন। প্রতিষ্ঠার প্রায় একশ বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে মন্দিরটির বড় অংশের সম্পত্তি এখন বে-দখল। জমি দখল হয়ে যাওয়ায় ধর্মীয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং দাতার মহান উদ্যোগের দৃশ্যমান চিহ্নও হারিয়ে যাচ্ছে।
তেলিহাটি গ্রামের প্রবীণ ব্যাক্তি শ্রী রবিন্দ্র কুমার রায় বলেন, উপজেলার দুইটি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ শতাধিক হিন্দু সম্প্রদায়ের তাদের পূর্ব পুরুষেরা এই মন্দিরে পূজা দিতেন, উৎসব করতেন এবং গ্রামীণ মিলনমেলার কেন্দ্র হিসেবে মন্দিরটি ব্যবহৃত হতো। এখন মন্দিরটি ধ্বংস স্তুপে পরিণত হতে থাকায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় নীহারঞ্জন বসু বলেন, মন্দিরের জমি দাতা প্রসন্ন কুমার বসু ১৯৩৩ সালে যখন এই মন্দিরের নামে জমি দান করে তখন শর্তের মধ্যে লিখা থাকে আমার বংশধরের মধ্যে পুরুষ ওয়ারিশ থাকা পর্যন্ত কন্যা এই সম্পত্তির ওয়ারিশ সেবায়িত হতে পারবে না।কিন্তুপ্রসন্ন কুমার বসু মারা যাওয়ার পর তার এক কন্যা বিনাপানী চন্দ সমস্ত জমি তার নামে রেকর্ড করান এবং তার এক ছেলে গৌতম চন্দ্র ওই জমি বিক্রি করেন। জমি বিক্রির পর জানতে পারি মন্দিরের নামে জমি দানকৃত জমি বিনাপানী চন্দের নামেরে কর্ড করা হয়েছে। আমি বাদী হয়ে ২০০৩ সালে আদালতে একটি রেকর্ড সংশোধনী মামলা দায়ের করি। যাচাইয়ের পর আদালত ২০০৯ সালে আমার পক্ষে ১ একর ৭৩ শতাংশ জমির রায় দেয়। যার মধ্যে একটি পুকুর ও মন্দির রয়েছে।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অরুন মোহন বসু বলেন, এই মন্দিরের সঙ্গে আমাদের শৈশবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। প্রতি উৎসবে মানুষ ভিড় করতো। এখন চোখের সামনে মন্দিরটা ভেঙ্গে যেতে দেখেও কিছু করতে পারছি না। সংস্কারের অভাবে মন্দিরটি হারিয়ে গেলে শুধু একটি স্থাপনা নয়, হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাসও।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অসিম কুমার রায় জানান, একসময় নিয়মিতভাবে পূজা পার্বণ, সামাজিক অনুষ্ঠান ও মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ হতো। মন্দিরের জমির আয় ব্যবহার করে টিকে ছিল এসব কার্যক্রম। কিন্তু জমি দখল হয়ে যাওয়ার পর থেকে সব কার্যক্রমেই স্থবিরতা নেমে এসেছে।
মন্দিরের জমি বেদখল নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বহুবার অভিযোগ করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। তাদের দাবি কাগজপত্রে জমি মন্দিরের হলেও বাস্তবে তা পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়েছে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয় বরং শ্রীপুরের শতবর্ষী ঐতিহ্যের অংশ। জমি দখলের ফলে ঐতিহ্যই আজ ঝুঁকির সম্মুখিন। প্রশাসন কার্যকর উদ্যোগ নিলে মন্দিরের জমি উদ্ধার ও সংস্কার সম্ভব। পাশাপাশি দানবীর প্রসন্ন কুমার বসুর ঐতিহাসিক অবদান স্মরণ রাখতে মন্দিরটিকে সুরক্ষিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









