কক্সবাজারের মহেশখালী পৌরসভার দক্ষিণ রাখাইন পাড়ায় প্রায় তিন শতকের পুরোনো রাখাইন শ্মশানের নির্মাণাধীন সীমানাপ্রাচীর ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক জামায়াত নেতা ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতের এ ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে শ্মশানের উন্নয়নকাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। দোষীদের শাস্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে প্রতিবাদে নেমেছেন স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ। উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে একদল ব্যক্তি নির্মাণাধীন সীমানাপ্রাচীরের একাংশ ভেঙে ফেলে। স্থানীয় জামায়াত নেতা সৈয়দুল হক সিকদারের ভাতিজা আরমান সিকদারের নেতৃত্বে এই হামলা হয়েছে বলে দাবি এলাকাবাসীর। এর আগে বুধবার দিনের বেলাতেও কয়েকজন ব্যক্তি নির্মাণস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের হুমকি দিয়ে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য করে। পরে রাতের আঁধারে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) বিকেলে ঘটনাস্থলে এক তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে রাখাইন সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষগণ। এ সময় সেখানে উপস্থিত হন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও মহেশখালী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুবক্কর ছিদ্দিক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত প্রাচীন এই শ্মশানের নিরাপত্তা ও সংস্কারের জন্য কক্সবাজার জেলা পরিষদের অনুদান, প্রবাসী ও স্থানীয়দের অর্থায়নে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রাখাইন সমাজ কমিটির সভাপতি বাতাইং রাখাইন ও সাধারণ সম্পাদক চেনথে মং বলেন, প্রায় আট-নয় বছর আগে উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই নির্ধারিত জায়গাতেই বিভিন্নজনের দান ও রাখাইন জনগোষ্ঠীর টাকায় প্রাচীর নির্মিত হচ্ছিল। এতে এভাবে বাঁধা দেওয়ার ঘটনা দুঃখজনক।
মহেশখালীর রাখাইন সমাজের নেতা সাবেক পৌর কাউন্সিলর মংলায়ান একে 'সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর আঘাত' আখ্যা দিয়ে বলেন, প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থাপনায় এমন হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিকরা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মহেশখালী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু বক্কর ছিদ্দিক এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি করেন।
এদিকে রাখাইন সমাজ কর্তৃক অভিযোগ তোলা আরমান সিকদার এক কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সীমানা প্রাচীর ভাঙার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান। তবে প্রাচীর নির্মানে বাঁধা বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, নিজেদের শ্বশান দাবি করে বিশাল এলাক ঘিরে ফেলেছে তারা, তাতেও কেউ কিছু বলেনি। এরইমধ্যে পৌরসভার ড্রেনসহ তাদের বাউন্ডারিতে ঢুকিয়ে ফেলার ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন তিনি, এটি জনগণের সম্পদ তাই সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কাজে থাকা শ্রমিকদের তিনি বাঁধা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে চেষ্টা করেও স্থানীয় জামায়াত নেতা ছৈয়দুল হক সিকদারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো জানাচ্ছেন, শ্মশানের জমিটি দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্দোবস্ত দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে।
মহেশখালী থানার ওসি মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এ ঘটনায় এখনও কেউ অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেনি, অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহেশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু জাফর মজুমদার জানিয়েছে, এ নিয়ে কেউ অভিযোগ করেনি, বিষয়টি জানার পর তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে জানান।
বর্তমানে ওই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের গ্রেপ্তার এবং স্থগিত সংস্কারকাজ পুনরায় শুরু করে শ্মশানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন রাখাইন সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সচেতন মহল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









