কুষ্টিয়ায় সিভিল সার্জন অফিসের অধীন বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল বাতিল না করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁস ও প্রশ্নপত্র তৈরি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর পরীক্ষা গ্রহণ করার পর ফলাফল স্থগিত করে রাখা হয়েছে। পরীক্ষার আগের দিন রাতে সিভিল সার্জন অফিসে প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়। পরীক্ষার কয়েক ঘন্টা আগে প্রশ্ন ফাঁসের মত অভিযোগ পাওয়া যায়। তারপরও পরীক্ষা গ্রহণ বাতিল না করে ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার মত গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন আলাদাভাবে তদন্ত করছে।
গত অক্টোবর মাসের শেষ দিকে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ৪ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখে দেখেনি। সেই ঘটনায় কারা জড়িত ও কার কি ভূমিকা তা নিয়ে পরীক্ষা কমিটির সদস্যরা একে অন্য দায়ী করেছেন। এসব কারনে বিষয়টি নিয়ে ধম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা গ্রহন ও জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক কমিটির নেতারা। প্রশ্নফাঁস ও প্রশ্নপত্র তৈরিতে যে ত্রুটি হয়েছে তার পেছনে সিভিল সার্জনের দায় আছে বলে মনে করছে দুদক ও স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের তদন্ত টিম।
এছাড়া প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হোসেন ইমামের বড় ভাই স্বাস্থ্য সহকারী হাসান ইমামের যোগসুত্র পেয়েছে তদন্ত টিম। দুদকের ও মন্ত্রনালয় গঠিত অনুসন্ধান টিম সিভিল সার্জন অফিসের নিয়োগ পরীক্ষায় নানা অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে পরীক্ষার আগের দিন রাতে সিভিল সার্জনের কক্ষে বসে ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নপত্র তৈরি ও প্রশ্ন ফাঁসের মত ঘটনার সত্যতা পেয়েছে।
এ ঘটনায় পরীক্ষা কমিটির সদস্য সচিব কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন নিজে দায় এড়িয়ে অন্যদের ওপর চাপান। তবে মন্ত্রনালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আলাদা তদন্তে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সাথে প্রশ্ন ফাঁসের সাথে কুষ্টিয়া ২৫০শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হোসেন ইমামের বড় ভাই স্বাস্থ্য সহকারী হাসান ইমামের সম্পৃক্ততা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। কমিটির অন্য ৪ সদস্যের সেদিন কি ভূমিকা ছিল তা নিয়েও তদন্ত চলমান রয়েছে। পরীক্ষার আগের দিন রাতে সিভিল সার্জনের অফিস কক্ষে অবস্থান করছিলেন পরীক্ষা কমিটির সদস্য সচিব সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেনসহ ৫ সদস্য।
নিয়োগ কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. মজিবুর রহমান, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপ-সচিব শাহাদত হোসেন কবির, পিএসসি খুলনার উপ-পরিচালক নাসরিন সুলতানা ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহাঙ্গীর আলম। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপ-সচিব শাহাদত হোসেন কবির, পিএসসি খুলনার উপ-পরিচালক নাসরিন সুলতানা ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তাদের বিষয়ে সুম্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রশ্নপত্র তৈরির সময় ৩ জন সদস্য প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ করেন সিভিল সার্জন। তবে সিভিল সার্জন নিজে পরীক্ষা কমিটির সদস্য সচিব হলেও পরীক্ষা বাতিল না করায় তার বিরুদ্ধেও অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
এর মধ্যে নাসরিন সুলতানা ও জাহাঙ্গীর আলম বলেন,‘ প্রশ্নপত্র তৈরিসহ সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন সিভিল সার্জন। সেখানে আমরা প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। এখানে আমাদের কোন ভূমিকা ছিল না। আমরা সহযোগিতা করেছি মাত্র। পরীক্ষার দিন ভোরে একটি ঘটনা ধরা পড়ার পর তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন এমন পরীক্ষার্থীদের অ্যাম্বুলেন্সে বোঝায় করে জেনারেল হাসাপাতালের আরএমও ডা. হোসেন ইমামের স্ত্রীর ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়। ভেতরে প্রশ্ন দিয়ে তাদের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে পরীক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়া হয় এমআরএমও’র বাড়িতে। ভোরে যখন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায় তখনই পরীক্ষা বাতিল করা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন তদন্ত টিম। এ দুটি ঘটনা সামনে নিয়ে তদন্তে নামেন দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি দল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুষ্টিয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন,‘ সিভিল সার্জন অফিসের নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর পরই তাদের টিম মাঠে নামে। জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. হোসেন ইমামের বড় ভাই স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত হাসান ইমামের সম্পৃক্ততা মিলেছে। তবে আরএমও’র সরাসরি কোন সম্পৃক্তা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে তার স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয় পরীক্ষার্থীদের। এসব কাজের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন হাসান ইমাম। তাকে গ্রেফতার করা হলে আরো গোপন তথ্য বেরিয়ে আসতো। তবে সেটি করা হয়নি। নিয়োগ পরীক্ষায় যেসব অনিয়ম হয়েছে সেখানে একটি সিন্ডিকেট কাজ করেছে। সবাই চিহিৃত করার কাজ চলছে। ওই সূত্র জানায়, সিভিল সার্জন পরীক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন। তিনি ঘটনার সাথে নিজের সম্পৃক্ততা নেই দাবি করলেও তার এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। কারন, তার কক্ষে বসেই সব ঘটনা ঘটেছে। তিনি প্রশ্ন তৈরি করেছেন। আগে থেকে তিনি পরীক্ষা বাতিল করতে পারতেন। তা না করে তিনি পরীক্ষা গ্রহন করেছেন। ওই দিন পরীক্ষা কমিটির অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে। সেগুলো খতিয়ে দেখতে দুদকের একটি টিম কাজ করছে। পুরো বিষয়টি সিভিল সার্জন অফিস থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল। প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষার সিট প্লান সব কিছু সিভিল সার্জন অফিস থেকে করা হয়। তবে কিভাবে প্রশ্ন বাইরে আসলো তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। কার মাধ্যমে প্রশ্ন বাইরে আসলো তা নিয়ে নানা ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। সিভিল সার্জন তার মত করে বিষয়টি ব্যাখা করলেও সেদিন তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
দুর্নীতি দমন কমিশন কুষ্টিয়া অফিসের উপ-পরিচালক মাঈনুল হাসান রওশনী বলেন,‘ আমরা তদন্ত করে কয়েকজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। পরীক্ষা ব্যবস্থায় ক্রটি পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আরো অধিকতর তদন্ত চলছে। পরীক্ষা কমিটির ৫জন সদস্যের কার কি ভূমিকা আছে সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
কুষ্টিয়া সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল আলম টুকু বলেন,‘ সিভিল সার্জন অফিসের যে নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে সেখানে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্ন প্রণয়ন কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ। এখন নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া উচিত।’ ২০১৮ সালে তৃতীয় ও ৪র্থ শ্রেনীর ১১৫ পদের বিপরিতে জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তার আগে প্রশ্ন ফাঁস ও প্রশ্নপত্র তৈরি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পরীক্ষায় কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









