রাজশাহী জুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনের পর দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিল্পকারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুতের এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বৃদ্ধদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
কৃষিতে মারাত্মক প্রভাব
রাজশাহীর পবা, গোদাগাড়ী ও দূর্গাপুর উপজেলার কৃষকরা জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কয়েকদিনের তাপপ্রবাহে সেচের অভাবে মাঠ ফেঠে চৌঁচির হয়ে গেছে।
জেলার পবা উপজেলার কৃষক সুলতান আলী বলেন, “দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। আসলেও ১৫ থেকে ২০ মিনিট থাকার পরে আবার টেনে নিচ্ছে। আমাদের জমিতে এখন পানি প্রয়োজন। সেচ পাম্প চালাতে না পারায় জমিতে পানি দিতে পারছি না। এভাবে চললে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।”
গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে আমাদের কৃষকদের। সেচ দিতে মেশিনের জন্য ডিজেলও পাচ্ছি না, আবার এইদিকে বিদ্যুৎও থাকছে না ঠিকমত। এভাবে চলতে থাকলে তো আমাদের জন্য অনেক সমস্যা।”
মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের কৃষক সায়েদুর আলী বলেন, “কয়েকদিন থেকে সূর্যের তাপ বেশি হওয়ায় পানির অভাবে আমাদের ক্ষেতের জমিগুলো ফেটে চৌঁচির হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা ডিজেল দিয়ে সেচ দিতে বাধ্য হচ্ছি, এতে খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। সরকারের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
শিল্প ও ব্যবসা লোকসানে
কৃষির পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে শিল্প ও ব্যবসা খাতেও। ছোট ছোট কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অনেক জায়গায় কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, এইভাবে চলতে থাকলে তাদের পথে বসতে হবে।
রাজশাহী মহনগরীর মুদ্রণ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, “প্রায় ১০-১২ দিন থেকে নিয়মিত লোডশেডিং চলছে। বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়। জেনারেটর চালাতে খরচ বেশি, এতে লাভ তো দূরের কথা, টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে।”
নগরীর সাহেববাজার এলাকার দোকানদার রাশেদ আলী বলেন, “দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। ফ্রিজে রাখা পণ্য নষ্ট হওয়ার উপক্রম। আবার এই গরমের ভিতরে বিদ্যুৎহীন দোকান ঘরে বসে থাকাও অনেক কষ্ট হয়ে পড়ছে। আমরা চাই অতিদ্রুত যেন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়।”
বিসিক শিল্প এলাকার ব্যবসায়ী সাহেব আলী বলেন, “এই দূর্ভোগের শেষ কোথায়? এভাবে বিদ্যূৎ না থাকলে তো আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। সারাদিনের ভিতরে বিদ্যুৎ না থাকায় আমার মিলের শ্রমিকের বসেই সময় পার করছে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থে হলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানাই।”
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি
গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামীন এলাকার মানুষেরা। অনেক এলাকায় দিনের পাশাপাশি রাতেও লোডশেডিং অব্যাহত থাকছে, ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে।
জেলার দূর্গাপুর উপজেলার উজানখলসী গ্রামের বাসিন্দা তৈয়মুর ইসলাম বলেন, “গত প্রায় ১৫ দিন থেকে আমাদের এলাকায় লোডশেডিং নিয়মিত হচ্ছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও কারেন্ট থাকছে না। এতে আমাদের পড়াশোনা এবং ঘুম কোনটাই হচ্ছে না।”
পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার পিল্লাপাড়া গ্রামের গৃহিনী জয়নব বেগম বলেন, “আমরা লোডশেডিং ভুলেই গেছিলাম। কিন্তু গত কয়েকদিন থেকে যেভাবে লোডশেডিং হচ্ছে তাতে আমাদের খুবই কষ্ট হচ্ছে। আমরা নতুন সরকারের কাছে দাবি জানাই, অতিদ্রুত যেন লোডশেডিং থেকে যেন আমরা মুক্তি পাই।”
রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, “রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না, আমরাও অসহ্য গরমে কষ্ট পাচ্ছি।”
শিক্ষার্থী তানভীর হাসান বলেন, “পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছি না। বিদ্যুৎ না থাকলে পড়াশোনা করা অসম্ভব হয়ে যায়।”
বিদ্যুৎ বিভাগ কি বলছে
তবে অবাকের বিষয় হলো, রাজশাহী নেসকো এবং রাজশাহী পল্লী বিদ্যূতের শীর্ষ দুই কর্মকর্তা লোডশেডিং বেশি হচ্ছে এটি মানতে তারা নারাজ। তারা জানান, রাজশাহীতে খুবই সামান্য সময়ের জন্য লোডশেডিং হচ্ছে।
নেসকো রাজশাহী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমানের কাছে লোডশেডিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “রাজশাহীতে ৪৭০ মেগাওয়াট বিদ্যূৎ চাহিদা রয়েছে। আমাদের এখানে বিদ্যূতের চাহিদা মিটিয়ে ১৬-১৭ ওয়াট বিদ্যূৎ অবশিষ্ট থাকছে। রাজশাহীতে লোডশেডিং খুবই কম সময়ের জন্য হচ্ছে। আমরা গ্রাহক চাহিদা এবং ভালো সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছি।”
চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সাময়িক ঘাটতির কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। খুব শিগগিরই লোডশেডিং কমে আসবে বলে জানিয়ে রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রমেন্দ্র চন্দ্র রায় বলেন, “রাজশাহীতে কিছুটা লোডশেডিং বেড়েছে। আমাদের এখানে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং এখন চলছে। আমাদের রাজশাহীতে পল্লী বিদ্যূতের বিদ্যূৎ চাহিদা রয়েছে ১০০ মেগাওয়াট। সে অনুযায়ী লোডশেডিং একেবারেই অল্প হচ্ছে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









