সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ নীলাভ জলধারা, কোথাও সাদা মাটির স্তূপ, কোথাও নদীর বিস্তীর্ণ বুকে নৌকার দোলা প্রকৃতি যেন তার সেরা রঙগুলো উজাড় করে দিয়েছে নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈচিত্র্যময় আদিবাসী সংস্কৃতি, যা এই অঞ্চলকে করেছে অনন্য ও আকর্ষণীয়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের মাঝেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক বড় শূন্যতা পরিকল্পনার অভাব আর দুর্বল অবকাঠামো।
দুর্গাপুর উপজেলার চীনা মাটির পাহাড় এখন দেশের ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে বহুল পরিচিত। সাদা পাহাড়, নীল পানির লেক আর ঢালু ভূপ্রকৃতির মিশেলে তৈরি হয়েছে মনমুগ্ধকর দৃশ্য। বিশেষ করে শীত মৌসুমে পর্যটকদের ঢল নামে এখানে। ছুটির দিনে পুরো এলাকা যেন পরিণত হয় উৎসবমুখর এক মিলনমেলায়।
এছাড়া সোমেশ্বরী নদীও পর্যটকদের কাছে সমান আকর্ষণীয়। বর্ষায় এর রূপ ভয়ংকর ও উদ্দাম, আর শুষ্ক মৌসুমে শান্ত ও স্বচ্ছ। নদীতে নৌকা ভ্রমণ কিংবা তীর ধরে হাঁটা সব মিলিয়ে এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা কাজী শিশির বলেন, “সপ্তাহান্তে এত মানুষ আসে যে ছোটখাটো মেলার পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু ভালো থাকার জায়গা ও মানসম্মত খাবারের অভাবে অনেকেই বেশি সময় থাকতে পারেন না।”
অন্যদিকে, কলমাকান্দা এখনো পর্যটনের দিক থেকে অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। সীমান্তঘেঁষা এই উপজেলায় রয়েছে বিস্তীর্ণ পাহাড়, ঝরণা এবং গারো সম্প্রদায়ের বসতি। এখানকার প্রকৃতি অনেকটাই অক্ষত থাকলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার দূর্বলতা পর্যটকদের আগমনকে সীমিত করে রেখেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সুজিতা সাংমা ও সুমন সরকার বলেন, “আমাদের এলাকায় অনেক সুন্দর জায়গা আছে, কিন্তু রাস্তার সমস্যা আর প্রচারের অভাবে মানুষ কম আসে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই উপজেলায় পরিকল্পিতভাবে পর্যটন খাত গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তরুণদের জন্য খুলবে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।
তবে এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। উন্নত সড়ক যোগাযোগ, নিরাপদ যাতায়াত, পর্যটকদের জন্য আবাসন, খাবার ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান বজায় রাখাও জরুরি।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পর্যটন উন্নয়নে ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণ, নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রচারণা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
জনপ্রতিনিধিরাও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
প্রকৃতি এখানে কার্পণ্য করেনি পাহাড়, নদী, সংস্কৃতি সবই দিয়েছে উদার হাতে। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা আর কার্যকর উদ্যোগ যাতে এই অপার সৌন্দর্য শুধু মুগ্ধতাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে ওঠে উন্নয়নের চালিকাশক্তি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









