সুন্দরবন থেকে বাঘের তাড়া খেয়ে লোকালয়ে আসা একটি হরিণ উদ্ধারের পর তার ক্ষতস্থানে কেউ ঔষধ লাগাচ্ছিলো, কেউ বিশুদ্ধ পানি খাওয়াচ্ছিলো, আবার কেউ হরিণটির মাথায় একটু পানি দিয়ে পরিচর্যা করছিল। চরম দায়িত্ববোধ আর পরম যত্নে হরিণটি বাঁচানোর নিরলস প্রচেষ্টা গ্রামবাসী ও উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের।
সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষের সাথে বন্যপ্রাণীর সংঘাতের পরিবর্তে এমন সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির চিত্র সত্যি বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ রক্ষায় এখন ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসাবে দেখছে সংশ্লিষ্টরা।
অথচ এমন একটা সময় ছিল যখন ভুল করে কোনো বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে এলে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারতো না। হরিণ তো দূরে থাক, হিংস্র বাঘ, বিষধর সাপ ও শূকর পেলেও শত্রু মনে করে মানুষ সংঘবদ্ধভাবে ঝাপিয়ে পড়ে পিটিয়ে মেরে ফেলত। বন্যপ্রাণী পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারার মধ্যেই ছিল তাদের এক ধরনের আদিম উল্লাস।
কিন্তু সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ে এখন আর তা কল্পনাও করা যায় না। গত দুই যুগে সরকারি-বেরসকারি প্রচারণা, বন ব্যবস্থাপনায় জনগণের অংশীদারত্ব ও সহ-ব্যবস্থপনা কার্যক্রমে এ এলাকার মানুষের মননশীলতায় এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন।
বিশেষ করে সিডর ও আয়লার মত দুর্যোগে সুন্দরবনের কারণে ব্যাপক ক্ষতি থেকে এই এলাকার মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার বিষয়টি ঠাঁই পেয়েছে মানুষের চেতনায়।
১৯ এপ্রিল সকালে বাঘের তারা খেয়ে একটি মায়াবী চিত্রল হরিণ ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। শরণখোলা উপজেলার খুড়িয়াখালী গ্রামের বাসিন্দা জামাল মীরের পুকুর পাড় থেকে বন বিভাগ, ওয়াইল্ড টিম, ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম (ভিটিআরটি) ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হরিণটিকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা স্টেশন কর্মকর্তা মো.খলিলুর রহমান বলেন, ‘‘এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সহায়তায় হরিণটি সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।’’
ওয়াইল্ড টিমের শরণখোলা ফিল্ড অফিসার মো. আলম হাওলাদার জানান, উদ্ধারকৃত হরিণটির ওজন আনুমানিক ২৫ কেজি। ধারণা করা হচ্ছে, বাঘের তাড়া খেয়ে হরিণটি নদী পাড় হয়ে সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। স্থানীয় জনগণের সহায়তায় হরিণটি উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামবাসীর দেয়া তথ্য ও সহযোগিতায় বন থেকে লোকালয়ে আসা আরও দুটি হরিণ ও অর্ধশতাধিক বিষধর সাপ, একটি বাজ পাখি উদ্ধার করে বনে ফিরিয়ে দেয়ার কথা জানান তিনি।
কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপ (সিপিজি) সদস্য সগির সওদাগর জানান, সুন্দরবনের বিশাল অজগর লোকালয়ে এসে দিনমজুরের আস্ত ছাগল গিলে খেয়েছে। তারপরও সাপটি কে কেউ আঘাত করেনি। রসুলপুর গ্রামবাসীর সহায়তায় সাপটি উদ্ধার করে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।
সুন্দরবন সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সহ-সভাপতি এম ওয়াদুদ আকন বলেন, ‘‘বন সংলগ্ন এলাকায় বন্যপ্রাণী ও মানুষের সাথে এখন আর সংঘাতের সম্পর্ক নেই। আগে যেখানে মানুষ বন্যপ্রাণী পিটিয়ে হত্যার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ পেত এখন সেই মানুষগুলি লোকালয়ে ঢুকে পড়া বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বনে ফিরিয়ে দেয়ার মধ্যেই আনন্দ খুজে পায়। বন ও পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









