দৈনন্দিন চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ নিয়ে চলছে ঈশ্বরদীর ৫ টি স্টেশন। এতে দিনরাত মিলিয়ে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ বিহীন জীবন যাপন করতে হচ্ছে এ অঞ্চলের নাগরিকদের। এতে করে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কমার পাশাপাশি কলকারখানা গুলোর উৎপাদন নেমেছে তলানিতে।
ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন শহর এবং গ্রাম গুলোতে ঘুরে জানা যায়, ফসলের জমিতে সেচ দিতে না পারায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ফসল। মুরগির খামার গুলোতে পর্যাপ্ত বিদ্যুতের অভাবে হিট স্ট্রোকে মারা যাচ্ছে ব্রয়লার সোনালীসহ খামারে পালন করা বিভিন্ন পশুপাখি।
মৌসুমি ফসল মুলা, পাট, পুঁই শাক, ঢেঁড়স, ডাটা শাক, ধুন্দল, ঝিঙা, পটল, ধান, লিচুসহ সকল ফসলই অতি রোদের তাপমাত্রার কারণে শুকিয়ে গেছে। শুকিয়ে যাওয়া এসব ফসলের জমিতে বিদ্যুতের অভাবে সেচ দিতে না পারায় ফসলগুলো শুকিয়ে মরে যাচ্ছে জমিতেই।
লিচু চাষি মুনসুর আলী বলেন, ‘‘এবার আমার বাগানে কম হলেও ৫ লক্ষ লিচু ছিল। কিন্তু অতিরিক্ত দাবদাহ আর সময়মতো পানি দিতে না পারায় গাছ থেকে লিচুর কড়ি ঝরতে শুরু করেছে। এভাবে ঝরতে থাকলে আমরা এবার পথে বসে যাব।’’
মুরগির খামারি মো. হাসান ইসলাম বলেন, ‘‘বিদ্যুৎ না থাকায় মুরগির খামারের ফ্যান বন্ধ থাকার কারণে খামারের মুরগি গুলো মারা যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ টি মরা মুরগি খামার থেকে বের করতে হচ্ছে। এভাবে মরতে থাকলে আমরা ব্যবসায়ীকভাবে ধ্বংশ হয়ে যাব। বিদ্যুতের এই অনিশ্চয়তা থেকে তিনি মুক্তি চেয়েছেন।
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক আরএমও এবং ঈশ্বরদীস্থ আলো জেনারেল হাসপাতালের স্বত্ত্বাধিকারী ডা. শামীম বলেন, ‘‘চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়াই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আগে যেখানে বিদ্যুতের ব্যাকআপ স্বরূপ আমাদের জেনারেটরের জ্বালানি খরচ হতো ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা সেটা বর্তমানে বেড়ে দেড় লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। মূলত আমাদের খরচ বর্ধিত হলেও বাড়েনি আয়। ফলশ্রুতিতে আমরা এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ব্যপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
ঈশ্বরদী মহিলা কলেজের উপাধাক্ষ্য ইসমাইল হোসেন বলেন, কলেজে বর্তমানে ইনকোর্স পরীক্ষা চলমান থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই। অফিসিয়াল কাজ করতেও ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে। শুধু তাই নয় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীরা রাতে ঠিকঠাক ঘুমাতে না পেরে অনেকেই শ্রেণি কক্ষে এসেই ঘুমাচ্ছে। চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও পড়েছে চরম বিপাকে।
আর আর পি গ্রুপের পরিচালক রফিক বলেন, বিদ্যুৎ সংকটে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি সেটা বলে বোঝানো সম্ভব না। কেননা ২ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এলেও থাকে মাত্র আধাঘণ্টা। এতে করে কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমছে। যা আমাদের উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ফিড উৎপাদন করতে না পারায় বাজারে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিদ্যুতের এই লোডশেডিং আমাদের সব কিছুই এলোমেলো করে দিয়েছে। বলতে গেলে বসিয়ে রেখেই বেতন গুনতে হচ্ছে কয়েক হাজার কর্মকর্তা কর্মচারীদের।
পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর প্রকৌশলী ওয়াজেদ বলেন, এই সংকট হয়তবো খুব দ্রুতই কেটে যেতে পারে। কেননা ডিজেল ব্যবহৃত বিদ্যুৎ উদপাদন করা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো আগামী সপ্তাহের মধ্যে চালু করার পরিকল্পনা করছে সরকার। সেগুলো চালু হলে আশাকরি লোড শেডিং অনেকটাই কমে যাবে।
পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, ঈশ্বরদী-১ উপকেন্দ্রের ডিজিএম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ঈশ্বরদী উপজেলাতে মোট ৫ টি বিদ্যুৎ স্টেশন রয়েছে। সেগুলোতে স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় ২৭ থেকে ২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু এই প্রয়োজনের তুলনায় পূর্বেই আমরা পেতাম ২৩ মেগা ওয়াট যা আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় ৪ থেকে ৫ মেগাওয়াট কম।
কিন্তু সম্প্রতি দেশে জ্বালানীর অভাবে কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়াতে বর্তমানে আমরা পাচ্ছি মোট ১১ মেগা ওয়াট বিদ্যুৎ যা বর্তমান চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম। যে কারণে আমাদের অনেক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। তবে কতদিন চলবে এই অবস্থা তার সঠিক তথ্য জানাতে পারেননি বিদ্যুতের এই কর্মকর্তা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









