নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের গোলাহাট এলাকায় রেলওয়ের বিশাল জলাধার এখন দখল আর ভরাটের কবলে পড়ে বিলুপ্তির পথে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ বড় জলাধারটি, যা ওই এলাকার হাজারো মানুষের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র ভরসা হিসেবে পরিচিত ছিল, সেটিই এখন পরিণত হচ্ছে আবাসিক প্লটে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী একটি চক্র লিজ নেওয়ার নাম করে অবৈধভাবে জলাধারটি ভরাট করে সেখানে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও জমি বিক্রি করছে, যা পুরো এলাকার পরিবেশ ও জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৈয়দপুরের শহরের গোলাহাট ১ নং অবাঙালি ক্যাম্প সংলগ্ন খানকাহ মসজিদের সামনে অবস্থিত রেলওয়ের ওই জলাধারটি দীর্ঘদিন ধরে আশপাশের কয়েক হাজার মানুষের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়াও অগ্নিকাণ্ডের সময় দমকল বাহিনীর পানির উৎস হিসেবেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রেলওযের বিশাল এই জলাধারটির দুই পাশ থেকেই ধাপে ধাপে মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সেখানে বড় বড় বারান্দাসহ ১০ থেকে ১২টি আধাপাকা ও পাকা কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। যেগুলো বিক্রি করেছে ওই দখলবাজ চক্রটি। আবার সামনে আরও অগ্রসর হয়ে মাটি ভরাট করে নতুন করে টিন দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে, যেটি ঘর তোলে অচিরেই বিক্রি করা হবে বলে জানা গেছে। ফলে জলাধারের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর ধারণক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাহমুদ নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে জলাধারটি লীজ নিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তা অবৈধভাবে ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রি করছেন। এতে এলাকাবাসী বাধা দিলে তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসী জানান, ঘনবসতিপূর্ণ গোলাহাট রেল কলোনীসহ আশপাশের এলাকায় শত শত বাড়ি ঘরের পানি নিষ্কাশনের জন্য এই জলাধারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে ড্রেনের পানি এই পুকুরেই এসে জমা হয়। ধাপে ধাপে এটি দখল হচ্ছে বলে এলাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে। এটি ভরাট হয়ে গেলে পুরো এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি অতীতে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের সময় এই জলাধার থেকেই দমকল বাহিনী পানি সংগ্রহ করেছে। ফলে এটি হারিয়ে গেলে অগ্নি নির্বাপনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।
এ অবস্থায় এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং রেলওয়ের বিভাগী ভুসম্পত্তি কর্মকর্তা (ডিইও) রেলওয়ের সম্পত্তি বিভাগ (কানুনগো), রেলওয়ের বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ন (ডিএসডাব্লু), সরকারি নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএম), রেলওয়ের পূর্ত বিভাগ (আইডাব্লু)সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগপত্রে জলাধার ভরাট বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) রেলওয়ের ভূসম্পত্তি বিভাগের (কানুনগো) কর্মকর্তা মহসিন আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তদন্তে গিয়েছিলাম। জলাধার দখল করে যেসব স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ। পুকুর লিজ নিয়ে কেউ তা ভরাট করে বিক্রি করতে পারে না। বিষয়টি যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এজন্য এলাকাবাসীকে রেলওয়ে পাকশী ভু-সম্পত্তি বিভাগে লিখিত আবেদন করতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি এলাকাবাসীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ওই জলাধারটি পুরো এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এলাকায় অগ্নি নির্বাপনেও বড় ভূমিকা রাখে। জলাধারটি দখল করে প্লট আকারে বিক্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এছাড়াও এ বিষয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে পূর্ত বিভাগের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী (এইএন) তহিদুল ইসলাম জানান, রেলের জমি কারোর পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। ওই জমি প্লট আকারে বিক্রি করা মানে চরম অপরাধের শামিল। সংশ্লিষ্ট বিভাগ অবশ্যই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিবে। বিষয়টি ওপরে জানানো হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত মো. মাহমুদ দাবি করেছেন, জলাধারটি তিনি লিজ নিয়েছেন। তবে রেলওয়ের জলাশয়টি ভরাট করে তা প্লট আকারে বিক্রি প্রসংগে সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতেও পারেননি তিনি।
এদিকে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অচিরেই জলাধারটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এতে কয়েক হাজার মানুষ জলাবদ্ধতা, পরিবেশগত, অগ্নিকাণ্ড বিপর্যয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে চরম দুর্ভোগে পড়বে। তাই তারা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









