উত্তরের মানুষের কাছে তিস্তা শুধু একটি নদীর নাম নয়, এটি জীবন-জীবিকা, কৃষি ও টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতীক। বছরের পর বছর শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট আর বর্ষায় আকস্মিক বন্যার দুর্ভোগে বিপর্যস্ত তিস্তাপারের জনজীবন। এমন বাস্তবতায় বহু আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও আশার আলো দেখছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ।
বিএনপি সরকার গঠনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর এবং আগামী জুনে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফরকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে। তিস্তাপারের মানুষের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার হয়তো প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসবে।
২০১৬ সালের পর টানা তিন বছর তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সমীক্ষা চালায় চীনের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না কনস্ট্রাকশন। শুরু থেকেই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়ে আসছে দেশটি। তবে ভারতের আপত্তির কারণে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এ বিষয়ে এগোতে পারেনি। পরে শেখ হাসিনা সরকার জানায়, তিস্তা প্রকল্পে ভারত কাজ করবে।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আবারও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে সঙ্গে নিয়ে তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করেন। এরপর বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে চীনের রাষ্ট্রদূত জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেইজিং প্রস্তুত রয়েছে।
এসব কূটনৈতিক তৎপরতায় আশাবাদী হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিদেশি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি নয়, এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা।
‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল। তিস্তাপারের মানুষ এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তারা দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরুর প্রত্যাশা করছেন।
রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি অর্থায়নের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে–এমন নয়।
তিনি বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন নেই। সরকার চাইলে পাঁচ বছরে প্রতি বছর দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েও কাজ এগিয়ে নিতে পারে। এখন আর প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ঝুলে আছে। এবারও যদি বাস্তবায়নে বাধা আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
সংগঠনটির সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, আগামী জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক চুক্তি হবে কি না, সেটি নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
তিস্তাপাড়ের মানুষের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় নদী প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত হয় নদীপারের বিস্তীর্ণ জনপদ। এতে কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশ–সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এমন বাস্তবতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে নয়, উত্তরাঞ্চলের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার উদ্যোগ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক আলোচনার বাইরে গিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায় তিস্তাপারের মানুষ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









