জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক অভিযাত্রার অংশ হয়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ করছে। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে নীরবে জমা হচ্ছে আরেকটি সংকট, যার দিকে এখনো পর্যাপ্ত নজর দেওয়া হয়নি।
আজ যে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের প্রতীক, কয়েক বছরের মধ্যেই সেগুলোর বড় অংশ পরিণত হবে বিপজ্জনক ই-বর্জ্যে। যথাযথ পরিকল্পনা, আইন ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা না থাকলে সবুজ জ্বালানির এই সাফল্যই আগামী দিনের পরিবেশের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের পাশাপাশি এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার সময় এখনই। যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা না থাকলে আজকের সবুজ শক্তিই আগামী দিনের পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণাগুলো স্পষ্টভাবে সতর্ক করছে, আগামী বছরগুলোতে বিপুল পরিমাণ সৌর-যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়বে। অথচ এই বর্জ্য সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য দেশে এখনো কার্যকর অবকাঠামো বা সমন্বিত নীতিমালা গড়ে ওঠেনি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদ্যমান ই-বর্জ্যের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। এতে সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদসহ বিভিন্ন বিষাক্ত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি শ্রমিক, বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
অন্যদিকে, মেয়াদোত্তীর্ণ সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি শুধু বর্জ্য নয়; এগুলো মূল্যবান সম্পদেরও উৎস। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন ও তামার মতো উপাদান পুনরুদ্ধার করে পুনরায় শিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে কার্যকর পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে যেমন পরিবেশ রক্ষা হবে, তেমনি আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিও লাভবান হবে। অর্থাৎ ই-বর্জ্যকে বোঝা নয়, সম্পদে রূপান্তরের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হলো একটি আধুনিক, বাস্তবমুখী ও কঠোর জাতীয় ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন।
উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের ব্যবহৃত সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি ফেরত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মানহীন পণ্য বাজারজাতকরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার স্থাপন, পুনর্ব্যবহার শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নিরাপদ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় এনে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃত সাফল্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে নয়; এর সম্পূর্ণ জীবনচক্র কতটা পরিবেশবান্ধবভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করে। তাই এখনই সার্কুলার ইকোনমি এবং ‘রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল’ নীতির কার্যকর বাস্তবায়নে সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে যে সবুজ শক্তির যাত্রা শুরু হয়েছে, সেটিই ভবিষ্যতে নতুন এক পরিবেশগত সংকটের জন্ম দেবে। সবুজ শক্তিকে সত্যিকার অর্থে টেকসই করতে হলে এর উৎপাদনের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে- এখনই, সময় থাকতে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









