চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিজয় বার্ষিকী আগামী ৫ আগস্ট আসতে আর খুব বেশি দিন বাকি নেই। আমরা এখনও ভুলতে পারিনি একটানা ১৬ বছরের স্বেচ্ছাচারি দুঃশাসনের কথা। জুলাইয়ের সেই গণঅভ্যুত্থানের সময় এবং তার আগে ১৬ বছর দুঃশাসনের সময়ে আত্মদানকারীদের ঘরে ঘরে এখনও স্বজনহারাদের আর্তনাদ শোনা যায়। এমন প্রেক্ষাপটে সেইসব হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন।
নির্বাসনে থাকা দলের নেতাদেরও তাঁর সঙ্গে দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তবে এটি বাস্তব কোনো পরিকল্পনা, নাকি আওয়ামী লীগকে আবার রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার কৌশল, তা নিয়ে দলটির ভেতরেই সংশয় রয়েছে। নেতাদের অনেকে বলছেন, শেখ হাসিনা নিজে ফিরবেন কি না, তার পাশাপাশি বড় প্রশ্ন হলো, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই ঝুঁকি নিতে শেষ পর্যন্ত কতজন নেতা-কর্মী প্রস্তুত আছেন। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য জনগণের ওপর সর্বশক্তি দিয়ে শেষ কামড় দিতে দিতেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।
একদিকে তিনি যখন হেলিকপ্টারে করে দেশ থেকে পালিয়ে ভারত যাচ্ছিলেন, অন্যদিকে তখনও তার অনুগত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা হত্যা করে চলেছে শত শত মানুষকে। শাহবাগ থেকে আনন্দ মিছিল করতে করতে বিক্ষুব্ধ জনতা চলে যায় হাসিনার বাসস্থান গণভবনে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় সংসদ ভবন ও গণভবনে প্রবেশ করে মানুষ তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ করে। বিজয় উদযাপন করে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা রাজপথে দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পতন উদযাপন করে। হাসিনা দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন ৫ আগস্ট।
অথচ এর কিছুদিন আগেই ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই গর্ব করে তিনি বলেছিলেন, 'শেখ হাসিনা পালায় না।' হাসিনা চলে গেলেও বিরত থাকে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিছু জায়গায় হাসিনার চলে যাওয়ার তথ্য না পেয়ে এবং কিছু জায়গায় জনরোষ দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তারা নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। সারা দেশের মানুষ আওয়ামী লীগের ওপর দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ করতে থাকে। হামলা হয় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য, পদধারী বড় নেতা ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মানুষের ক্ষতি সাধনকারীদের বাড়ি, দলীয় কার্যালয়ে। হামলা হয় থানাগুলোতেও।
দেশের অধিকাংশ থানার কার্যক্রম বন্ধ করে পালিয়ে যায় পুলিশ সদস্যরাও। চব্বিশের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের পর ৫ আগস্ট প্রবল জনরোষের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনা করে। এ সময়ে শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে শত শত হত্যা মামলা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও শেখ হাসিনাসহ দলের একাধিক নেতার বিচার শুরু হয়। গত বছরের ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাঁদের বিরুদ্ধে আরো কয়েকটি মামলার বিচার চলমান। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর শেখ হাসিনাসহ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ভারত সরকারকে চিঠি দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ভারত বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানালেও প্রত্যর্পণের বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি প্রকাশ্যে আসেনি।
বর্তমান বিএনপি সরকারও শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের কথা বলেছে। শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান, ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের চিঠি দেওয়া- সব মিলিয়ে বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে বেশ প্রভাব ফেলেছে। জনগণের বিচারের কথা বললেও ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা এখনো প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেননি। বরং তিনি ও তাঁর দলের নেতারা আন্দোলনকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরছেন এবং গণআন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করে চলেছেন। ফলে দেশে ফেরার ঘোষণায় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের বার্তা দিলেও এর সঙ্গে আত্মসমালোচনা বা অতীতের দায় স্বীকারের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা-কর্মীরা অতীতে বিভিন্ন সময়ে তাদের নেত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের রেফারেন্স টেনে এবার আবার তার ফিরে আসা নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা বলছে। আগামী ডিসেম্বরে তার ফিরে আসা নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা, উদ্দীপনা দেখা গেলেও এটার বাস্তবতা কতটা, সেটা বিবেচনার বিষয়। এখনকার বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। আওয়ামী লীগের সমর্থক গোষ্ঠী শেখ হাসিনার অতীতে দেশে ফিরে আসার যে সব রেফারেন্স তুলে ধরে বর্তমান সময়ের সাথে মেলাতে চাইছে, এখন কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশে একটানা ১৬ বছর ধরে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের হাতে নিষ্পেষিত এদেশের মানুষ এত সহজে সবকিছু ভুলে যায়নি এবং ভুলে যাবেও না।
গুম, খুন, নিপীড়ন, পৈশাচিকতা, নির্মমতার শিকার লক্ষ লক্ষ পরিবারে এখনও প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। তারা এখন এই হত্যাকারী বর্বর স্বেচ্ছাচারী শাসককে হাতের নাগালের মধ্যে পেলে ছেড়ে দেবে না। সাধারণ জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটবেই, যা ঠেকানো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে হয়ত সম্ভব হবে না। চব্বিশের ৫ আগস্ট তার হেলিকপ্টারে চড়তে আর একটু দেরি হলে কী যে অবস্থা হতো তার , এটা তো শেখ হাসিনা নিজেই উপলব্ধি করে এখন শিউরে ওঠেন বারবার। চব্বিশের জুলাই আগস্টে হাজার হাজার মানুষ হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা স্বেচ্ছাচারী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসলে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ইসলামী আন্দোলন, হেফাজতে ইসলাম এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি একযোগে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামবে চব্বিশের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের সময়ের মতো। তখন তো শেখ হাসিনা কিংবা তার দলের সহযোগী শক্তি হিসেবে আগের মতো পুলিশ, র্যাব, এসএসএফ, বিজিবি, সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে সুরক্ষা দিতে পাশে এসে দাঁড়াবে না। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তো কোনোভাবেই শেখ হাসিনা এবং তার আওয়ামী লীগের নাম শুনতে পারে না।
তার প্রসঙ্গ উঠলেই গালিগালাজ, খিস্তি-খেউর চলতে থাকে তাকে উদ্দেশ্য করে। এখন কার ভরসায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন, এটা প্রশ্ন। ভারতের সহায়তায় যদি বাংলাদেশে ঢুকতে চান তাহলে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠবে সর্বত্র সেটা ঠেকাবেন কীভাবে। ভারতীয় সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনীর সহযোগিতায় ঢুকতে গেলে তো একটা যুদ্ধ বেধে যাবে নির্ঘাত। বর্তমান বাস্তবতায় এটা কি সম্ভব? অহেতুক নষ্ট করার মতো এতো সময় নেই ভারতের। তাদের একান্ত বিশ্বস্ত ও অনুগত শেখ হাসিনাকে রক্ষার জন্য এত বড় ঝুঁকি নিতে যাবে না এই মুহূর্তে। উপমহাদেশের বিদ্যমান শান্তি বিনষ্টের বদনাম তারা নিতে যাবে কোন দুঃখে?
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কাকতালীয় ব্যাপার হলো, স্বাধীনতার পর যে কয়টি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে সবগুলোর ফলাফল হিসেবে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। ১৯৭৫ সালের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসেন খালেদা জিয়া। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় এসেছেন তারেক রহমান। এর অর্থ হলো, জনগণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিবাচক রূপান্তরের দায়িত্ব বারবার বিএনপিকে দিয়েছে। এই দায়িত্বের তাৎপর্য যদি বিএনপি বুঝতে ব্যর্থ হয় তবে জাতির কপালে গভীর দুঃখ নেমে আসবে। ফলে, বিএনপি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিবাচক রূপান্তরের জন্য সর্বোচ্চ মনোযোগ দেবে এটাই আমরা আশা করি। তারা শেখ হাসিনাকে বিনা বাধায় দেশে ঢুকতে দেবে না কোনোভাবেই।
এতদিন শেখ হাসিনার বয়ান ছিল, ৫ আগস্ট নাকি টেরই পায়নি তাকে ভারতে নেওয়া হচ্ছে। তার ধারণা ছিল, তাকে গোপালগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে! আর তাঁর মুখের ডাহামিথ্যা শুনে তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ, বিদেশে পালানো কর্মী আর কিছু দালাল সাংবাদিক এতদিন ধরে একই স্ক্রিপ্ট তোতা পাখির মতো আউড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সম্প্রতি ভারতের পার্লামেন্টে পররাষ্ট্র মন্ত্রী জয়শঙ্কর এসে পুরো রহস্য উন্মোচন করে দিয়েছেন তার বক্তব্যে। এটা আবার কোনো হাটে-মাঠে দেওয়া পলিটিক্যাল লেকচার না, একদম পার্লামেন্টের অন-রেকর্ড স্টেটমেন্ট, যা আজীবন থেকে যাবে। জয়শঙ্কর একদম সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, বাংলাদেশের কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ বা এস্টাবলিশমেন্ট চব্বিশের ৫ আগস্ট ভারত সরকারকে কোনো অনুরোধ জানায়নি । বরং শেখ হাসিনা নিজেই ফোন করে তার প্রিয় প্রভুর দেশের কাছে আশ্রয় ভিক্ষা চেয়েছেন।
জয়শঙ্করের এই বক্তব্যই এখন সবচেয়ে বড় দালিলিক প্রমাণ। নিজে প্রভুর কাছে কান্নাকাটি করে পালিয়ে গিয়ে এখন ভিকটিম কার্ড খেলছেন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তখন হাসিনার হাতে ছিল রাষ্ট্রের সর্বময় নিয়ন্ত্রণ। পুলিশ, র্যাব, এসএসএফ, সামরিক বাহিনী সবই ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণে। আর ছিল তাঁর হাজার হাজার সমর্থক, যাদের লাঠিসোঁটা আর আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হতে দেখা গেছে। তাঁর ও তাঁর সমর্থকদের দাবি, তাঁর নাকি পাহাড়সম জনপ্রিয়তা। এ সত্ত্বেও তিনি এ দেশে নিজেকে নিরাপদ মনে করলেন না! তাঁর প্রতি সহানুভূতি জানাতে সেদিন হাজার পাঁচেক লোকও গণভবনের সামনে হাজির হলো না! কেউ এসে সুরক্ষা দিতে মানবপ্রাচীর গড়ে তুলতে পারল না। তখন বাধ্য হয়েই প্রাণ বাঁচাতে ভারতে তিনি চলে গেলেন!
শেখ হাসিনাকে ঢাকায় ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করার দাবি, হুমকি, মাতম সবই চলছে। কিন্তু তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। হাসিনা এখন ভারতে। সম্ভবত নয়াদিল্লিতে কঠোর পাহারা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে আছেন। একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসছে- তিনি কি নির্বাসনে? তাঁকে কি জোর করে দেশছাড়া করা হয়েছে? নাকি তিনি স্বেচ্ছায় গেছেন? এ নিয়ে একটা সন্দেহ আছে। কেননা, এর আগেও তিনি নির্বাসনে গেছেন। ১৯৭৫ সালের আগস্ট হত্যাকাণ্ড ও একদলীয় বাকশাল সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে ছিলেন প্রায় ছয় বছর।
তিনি প্রায়ই বলার চেষ্টা করেছেন, ওই সময় তাঁকে দেশে আসতে দেওয়া হয়নি। তাঁর এ কথা তাঁর দলের লোকেরাও বিশ্বাস করেন। আসলে কি তাই? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাসনে যান। তিনি পদত্যাগ করেছেন নাকি করেননি, তাঁকে কি জোর করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, নাকি তিনি স্বেচ্ছায় গেছেন, এটা কি একটা আপসের প্রস্থান, নাকি প্রাণভয়ে পালিয়েছেন- এসব নিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। শেখ হাসিনাসহ অনেকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মামলা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এবং মামলা সচল রয়েছে। একটি মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। বিচারটা যেভাবে তড়িঘড়ি করে করা হয়েছে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে- আসলে কি তাঁকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এভাবে রায় দেওয়া হয়েছে, নাকি আপাতত তাঁকে ঠেকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে এটা করা হয়েছে।
দেশ ১৬ বছর ধরে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। এখন আমরা চাই, তিনি দেশে ফিরবেন, ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য। বাংলাদেশে রায় হয়ে গেছে। এখন সরকারের উচিত যথাযথ কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় গণহত্যাকারীকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা। শেখ হাসিনা কীভাবে আসবেন, তিনি কাদের নিয়ে আসবেন, তিনি সারেন্ডার করবেন কি করবেন না। এটা ঠিক করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে দিল্লির সঙ্গে কথা বলবে। এখানে আর কোনো পক্ষ নেই। ফলে সরকারই ঠিক করবে তাকে কখন আনবে, কীভাবে আনবে এবং কীভাবে বিচারের রায় কার্যকর করবে। সব প্রস্তুতি নিয়েই তাকে আনতে হবে। বাংলাদেশে এখন আওয়ামী লীগকে দলগতভাবে বিচারের আওতায় নেওয়ার কথা সরকারও ভাবছে। আমরা মনে করি, এটাই সঠিক রাস্তা। শেখ হাসিনার রায় ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। এখন এটা কার্যকর করতে হবে। শেখ হাসিনা যদি দেশে ফিরেও, কেবল ফিরবে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য।
শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। দিল্লি থেকে তাকে যতটুকু পারমিট করা হয়, সে অনুযায়ী তিনি কথা বলেন। ফলে শেখ হাসিনা আসবেন কি আসবেন না, কীভাবে আসবেন, বিচার হবে কি না? এসব মূলত দিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করবে। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ এখন কোনো রাজনৈতিক দলই নয়। জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীরা এখনো যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা অংশগ্রহণ করেছেন, রাজনৈতিকভাবে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তাঁরা প্রস্তুত আছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতির সুরক্ষায় তাঁরা সবসময় যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছেন।
শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার যদি কোনো ধরনের পাঁয়তারা বা প্রচেষ্টা হয়, সরকার যদি সেটাকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন সরকারই হবে। বাংলাদেশের আপামর জনগণ, জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষ, ত্রিশ হাজার আহত ও ১ হাজার ৪০০ শহীদ পরিবারের সদস্য, সবাই প্রস্তুত রয়েছে। সম্প্রতি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় দেরিতে হলেও জাতির ঘাড় থেকে স্বৈরাচারের একটি কালো ছায়া সরে গেছে।
তিনি কী কারণে পদত্যাগ করেছেন, সে বিষয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। কারণ, আমরা আগেই বিবেচনায় নিয়েছি যে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। এতো দিন ধরে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে বহাল রাখা নিয়ে নানা বিতর্ক, সমালোচনা, প্রতিবাদ ছিল। এ নিয়ে অস্বস্তি ছিল বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দের মধ্যেও। আমরা পতিত স্বৈরাচারের কোনো ছায়া পড়তে দিতে চাই না বর্তমান সরকারের ওপর। এটা সরকারকে নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









