বাংলায় একটি পরিচিত প্রবাদ আছে- ‘মুলা ঝুলানো’। অর্থাৎ সামনে আশার আলো দেখানো হবে, কিন্তু সেই আশা পূরণের মুহূর্ত বারবার পিছিয়ে যাবে। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্তমান অবস্থা অনেকটা তেমনই মনে হচ্ছে। তারা নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষায় আছেন। দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা শুনছেন। সম্ভাবনার খবর পাচ্ছেন। হিসাব কষছেন। কিন্তু গেজেট আর প্রকাশ হচ্ছে না। যতই সময় যাচ্ছে, ততই অনিশ্চয়তা বাড়ছে। দৈনিক সমকালে প্রকাশিত সর্বশেষ ‘সরকারি চাকরিজীবীদের পে স্কেল পিছিয়ে যাচ্ছে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর সেই অনিশ্চয়তাকেই আরো স্পষ্ট করেছে।
পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগ্রহ নতুন নয়। ২০১৫ সালের পর আর কোনো জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা হয়নি। এর মধ্যে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হয়েছে। কিছু বিশেষ সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নতুন পে-স্কেলের দাবি থেকেই গেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই দাবি আরো জোরালো হয়। আন্দোলনও হয়েছে। সরকারও চাপের মধ্যে পড়েছিল।
পরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। তখন আবার আশার আলো দেখা যায়। এরপর বিভিন্ন সময় শোনা গেছে, নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ খুব শিগগিরই হবে। বাজেটেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে। অনেকেই সম্ভাব্য বেতন হিসাব করতে শুরু করেছেন। কার কত বেতন বাড়বে, কত ভাতা যুক্ত হবে, সবকিছু নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আমার নিজের পরিচিত অনেক সরকারি চাকরিজীবীকেও এই হিসাব করতে দেখেছি। তাদের চোখে ছিল প্রত্যাশার ঝিলিক।
কিন্তু সেই প্রত্যাশায় এখন আবার ভাটা পড়েছে। দৈনিক সমকালের সংবাদ বলছে, আগামী মাসে গেজেট প্রকাশের যে পরিকল্পনা ছিল, সেটি আপাতত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আরো পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়। সামনে আরও কয়েকটি বৈঠক হবে। তারপর সুপারিশ যাবে মন্ত্রিসভায়। এরপর অনুমোদন মিললে গেজেট প্রকাশ করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
এই বিলম্বের পেছনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ। সমকালের সংবাদ অনুযায়ী, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময় আইএমএফ অন্তত দুই বছর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। কারণ, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। সেই অতিরিক্ত ব্যয় দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে তাদের প্রশ্ন রয়েছে।
এখানেই মূল জটিলতা। বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা মতো বাড়ছে না। উন্নয়ন ব্যয়ও অনেক। বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতাও কম নয়। অতীতের আর্থিক অব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংক খাতের সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। ফলে সরকার একদিকে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে চায়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের আস্থাও ধরে রাখতে চায়। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পে-কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বিভিন্ন ভাতাও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এসব বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা। যদিও সচিব কমিটি কিছু কাটছাঁটের সুপারিশ করেছে। তবুও ব্যয়ের পরিমাণ কম নয়। তাই সরকার বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
অবশ্য সরকারি চাকরিজীবীদের অবস্থাও সহজ নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাদের জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। অনেকের সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় নতুন পে-স্কেলের দাবি অযৌক্তিক নয়। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় নতুন বেতন কাঠামো না পাওয়াও একটি বাস্তব সমস্যা। তাই তাদের প্রত্যাশাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দেশের লাখ লাখ বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন তো একসঙ্গে বাড়বে না। তাদের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়ে যেতে পারে। আমাদের দেশে একটি প্রবণতা বহুদিন ধরেই দেখা যায়। সরকারি বেতন বাড়ার খবর এলেই বাজারে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা অনেক সময় পাওয়া যায় না। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষ সেই চাপ বহন করেন। ফলে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত শুধু সরকারি কর্মচারীদের বিষয় নয়। এটি পুরো অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। সেই কারণে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, বিষয়টি এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু সমকালের প্রতিবেদনে যে তথ্য এসেছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে বাস্তবতা আরও জটিল। অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভার আগে সরকার হয়তো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না। আবার সরকারও পুরো বিষয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখতে আগ্রহী নয়।
আমার মনে হয়, এখানে আবেগের চেয়ে বাস্তবতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শুধু জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতাও থাকতে হবে।
ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে বড় ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। আবার, দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা সরকারি চাকরিজীবীদেরও অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা উচিত নয়। তাই সরকারকে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ রাখা। বাস্তব পরিস্থিতি তাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা দরকার। কারণ, অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বেশি হতাশা তৈরি করে। মানুষ অনেক সময় বিলম্ব মেনে নিতে পারে। কিন্তু অস্পষ্টতা সহজে মেনে নিতে পারে না।
আমার ধারণা, অক্টোবর পর্যন্ত এই অপেক্ষা চলতে পারে। এটি কোনো নিশ্চিত তথ্য নয়। বর্তমান পরিস্থিতি এবং সমকালের প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে এমন ধারণাই তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, নতুন পে-স্কেল শুধু একটি বেতন কাঠামোর প্রশ্ন নয়। এটি দেশের অর্থনীতি, রাজস্ব, আন্তর্জাতিক ঋণ, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সিদ্ধান্তও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করে। আশা করা যায়, সরকার সেই ভারসাম্যপূর্ণ পথই বেছে নেবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









