দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক। এসব ঘটনার ফলে শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, বিতর্ক হবে, গণতান্ত্রিক চর্চা হবে। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যখন লাঠিসোঁটা, হামলা কিংবা দখলদারিত্বের রাজনীতিতে রূপ নেয়, তখন তা শিক্ষা ও সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি- উভয়ের জন্যই অশনিসংকেত। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা, উসকানি ও সহিংসতার অভিযোগ তুলেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্ব।
বাংলাদেশের ক্যাম্পাস রাজনীতির ইতিহাস দীর্ঘ। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সেই গৌরবময় ঐতিহ্য আজ অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, প্রভাব বিস্তার এবং সাংগঠনিক আধিপত্যের লড়াইয়ে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় রাজনীতির উত্তাপ যখন সরাসরি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র না হয়ে সংঘাতের ময়দানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিটি সংঘাতের মূল্য দিতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। তাদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়, নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, হল ও ক্যাম্পাসজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী রাজনৈতিক পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও সহিংসতার শিকার হন কিংবা আতঙ্কে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে ওঠার স্থান যদি ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়, তবে তা জাতির জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও তাদের ছাত্রসংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ডের দায় নিতে হবে এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি সুস্থ সমাজের অপরিহার্য অংশ। তবে সেই স্বাধীনতা কখনোই সহিংসতা, দখলদারিত্ব বা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হতে পারে না। ক্যাম্পাসে যদি যুক্তির বদলে শক্তির প্রদর্শন প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষা, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশ।
এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সংঘাত নয়, সংলাপ ও গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে পরিচালিত করার। বিশ্ববিদ্যালয়কে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, মুক্ত ও জ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ হিসেবে ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ, ক্যাম্পাস কারও একক আধিপত্যের জায়গা নয়; এটি সকল শিক্ষার্থীর, জ্ঞানচর্চার এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









