আমন মৌসুমে কৃষকের জন্য সার কোনো বিলাসপণ্য নয়, এটি উৎপাদনের অন্যতম অপরিহার্য উপকরণ। অথচ, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় সারের জন্য কৃষকদের দীর্ঘ লাইন, রাতভর অপেক্ষা, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, এমনকি গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা এখন উদ্বেগজনক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রশাসন বলছে, পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে; অন্যদিকে কৃষকের অভিযোগ, ডিলারের দোকানে গেলে সার মিলছে না, অতিরিক্ত দাম দিলে আবার খোলা বা গোপন বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে। এই পরস্পরবিরোধী চিত্রই সংকটের গভীরতা এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট করে।
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে কৃষকেরা রাত দুইটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সকালে সার না পেয়ে গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে সার নিয়ে গেছেন- ঘটনাটি নিছক আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, অনাস্থা ও সরবরাহব্যবস্থার প্রতি কৃষকের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। একইভাবে ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকদের সড়ক অবরোধ ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে ঘিরে রাখার ঘটনা, রাজশাহীর পুঠিয়া এবং লালমনিরহাটে মহাসড়ক অবরোধ- সবই বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে সংকট আরো বিস্তৃত হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকারিভাবে পর্যাপ্ত সার থাকার দাবি সত্য হলে কৃষকের হাতে তা পৌঁছাচ্ছে না কেন? আর যদি বাস্তবেই কোথাও সাময়িক ঘাটতি থাকে, তাহলে কৃষকদের তা স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে না কেন? সরবরাহ, মজুত ও বিতরণের তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকলে গুজব, মজুতদারি ও কালোবাজারির সুযোগ তৈরি হয়। বগুড়ার ধুনটে সরকারি ভর্তুকির ৭৬ বস্তা সার অবৈধভাবে মজুতের অভিযোগে চার ব্যবসায়ীকে জরিমানা ও সার জব্দের ঘটনা এই আশঙ্কাকেই আরো জোরালো করে।
সারের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী বা অসাধু ডিলারদের কারসাজি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে একই সঙ্গে সব ডিলারকে দায়ী না করে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করাও জরুরি। মাসের শেষ দিকে কোনো কোনো ধরনের সারের মজুত কমে গেলে আগে থেকেই সরবরাহ পুনর্বিন্যাস করা, চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া এবং সংকটপ্রবণ এলাকায় দ্রুত অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল ও প্রকাশ্য মজুত তথ্যব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি ডিলারের কাছে কত সার এসেছে, কত বিক্রি হয়েছে এবং কত অবশিষ্ট আছে- এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে কৃষক যেমন বাস্তব পরিস্থিতি জানতে পারবেন, তেমনি অনিয়মের সুযোগও কমবে। কৃষকের পরিচয় যাচাই করে নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। তবে কোনো সংকটই গুদাম ভাঙচুর বা সার লুটের বৈধতা দেয় না। কৃষকের ন্যায্য দাবি পূরণ করতে হবে, আবার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে। কারণ, লুটপাটের সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত প্রকৃত কৃষককেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার নিয়ে এমন অস্থিরতা শুধু একটি পণ্যের সংকট নয়; এটি কৃষি ব্যবস্থাপনা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়ে সরবরাহব্যবস্থা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা না গেলে এর খেসারত দিতে হবে কৃষককে, আর শেষ পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদনকেও। সরকারের দায়িত্ব শুধু ‘সার আছে’ বলা নয়- সেই সার যেন সময়মতো, সঠিক দামে এবং প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছে, সেটিই নিশ্চিত করা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









