কোনোভাবেই থামছে না মৃত্যুর মিছিল। একদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ডেঙ্গুও কেড়ে নিচ্ছে একের পর এক প্রাণ।
দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে একই সময় দুটি সংক্রামক রোগের এমন বিস্তার গভীর উদ্বেগের বিষয়। শনিবার ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আটজনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ১৫২ জনের আক্রান্ত হওয়ার তথ্য যেমন আতঙ্ক তৈরি করছে, তেমনি একই সময় ডেঙ্গুতে ছয়জনের মৃত্যু ও ১ হাজার ৬০৮ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাও আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই মৃত্যুগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ক্রমবর্ধমান সংক্রমণের একটি ভয়াবহ চিত্র।
হামের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুতর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১২২-তে পৌঁছেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০২ জনের এবং উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২০ জনের। একই সময় সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ এবং নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ২১ হাজারের বেশি। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়; বরং টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং জনসচেতনতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়।
হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা। তাই কোথায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে, কোন বয়সী শিশু বা কোন জনগোষ্ঠী টিকার আওতার বাইরে রয়েছে এবং কেন তারা টিকা পায়নি—এসব প্রশ্নের দ্রুত উত্তর খুঁজতে হবে। শুধু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিয়ে হাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল, বস্তি, দুর্গম এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত ও দ্রুত পৃথকীকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
ডেঙ্গুর চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। চলতি বছর ইতিমধ্যে ২৫৬ জনের মৃত্যু এবং ৮৪ হাজারের বেশি মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য আমাদের সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসেই ১৪৮ জনের মৃত্যু প্রমাণ করে, ডেঙ্গু এখন আর নির্দিষ্ট মৌসুমের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মশার বিস্তার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ডেঙ্গুর বিস্তার সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে হাসপাতাল বাড়ানোর পাশাপাশি রোগের উৎস নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাম ও ডেঙ্গু—দুটির ক্ষেত্রেই আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি যেন মৃত্যুর অন্যতম কারণ না হয়। রোগের প্রকোপ বাড়ার পর তৎপর হওয়ার পরিবর্তে সারা বছর নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রোগীর চাপ সামলাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। হামের ক্ষেত্রে শিশুদের নির্ধারিত টিকা নিশ্চিত করা এবং জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জ্বর হলে অবহেলা না করা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু। তাই হাম ও ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আজকের উদ্বেগ আগামী দিনের আরো বড় স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









