একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রকৃত মাপকাঠি শুধু প্রবৃদ্ধির হার কিংবা মাথাপিছু আয় নয়, বরং সেই অগ্রগতির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম আর মজুরি বৃদ্ধির মন্থর গতি শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে ক্রমেই দুর্বিষহ করে তুলছে। আয় বাড়লেও ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে প্রতিদিনের জীবন নির্বাহ করাই এখন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও সন্তানের শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। এর ওপর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন ও নিত্যপণ্যের ব্যয় আরো বাড়িয়ে তুললে সংকটের ভার শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় এই খেটে খাওয়া মানুষকেই। অর্থনীতির চাকা সচল রাখার প্রধান শক্তি শ্রমিকশ্রেণির জীবনমান যখন ক্রমাগত অবনতির দিকে যায়, তখন সেই অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ শ্রমিকের আয় বাড়লেও সেই বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য নেই। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হারের নিচে থাকলে প্রকৃত আয় কমে যায় এবং ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়। এর অর্থ, আগের সমপরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে শ্রমিককে এখন আয়ের আরো বড় অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ফলে, খাদ্যতালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবার বাদ দেওয়া, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা সন্তানের শিক্ষার খরচ কমিয়ে আনার মতো বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে বহু পরিবারকে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণই যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এই সংকটের অন্যতম কারণ শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা। দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যেখানে নির্ধারিত মজুরি, নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা সীমিত। কৃষি, নির্মাণ, ইটভাটা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিভিন্ন সেবামূলক পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকদের বড় অংশই নিয়োগকর্তার সঙ্গে দর-কষাকষিতে দুর্বল অবস্থানে থাকেন। কাজ হারানোর আশঙ্কায় তাঁরা অনেক সময় অযৌক্তিক মজুরিও মেনে নিতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তাঁদের কম মজুরি দেওয়া শ্রমবাজারে বিদ্যমান বৈষম্যকে আরো প্রকট করে। একই কাজের জন্য নারী ও পুরুষের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা তাই জরুরি।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক কর্মপ্রার্থীর প্রবেশও মজুরি বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকলে শ্রমিকের বিকল্প কাজ পাওয়ার সুযোগ কমে যায়, আর তখন মজুরি নির্ধারণে নিয়োগকর্তার প্রভাব বাড়ে। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের বক্তব্যেও বিনিয়োগের ঘাটতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শ্রমিকদের দুর্বল দর-কষাকষির সক্ষমতার বিষয়টি উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশাও ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও নিয়মিত সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সমস্যার সমাধান শুধু মজুরি বাড়ানোর ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; শ্রমবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও দূর করতে হবে।
এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মজুরি পুনর্নির্ধারণের কার্যকর ব্যবস্থা। বিভিন্ন খাতের জীবনযাত্রার ব্যয়, শ্রমের ধরন ও উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার, যৌথ দর-কষাকষির সুযোগ এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর প্ল্যাটফর্ম নিশ্চিত করা জরুরি। নারী শ্রমিকের সম-মজুরি ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগও জোরদার করা প্রয়োজন।
শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি টেকসই অর্থনীতির অন্যতম পূর্বশর্ত। মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে বাজারে চাহিদা বাড়ে, উৎপাদন ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হয়। তাই শ্রমের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করতে মজুরি সমন্বয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সরকার ও মালিকপক্ষকে এ ক্ষেত্রে সমন্বিত দায়িত্ব পালন করতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান আরো অবনতির দিকে না যায়। মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নত না হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









