বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প শুধু দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি নয়, লাখো শ্রমিকের জীবন-জীবিকারও প্রধান অবলম্বন। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কারণে পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানা বন্ধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধের ঘটনায় এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত আজ গভীর সংকটের মুখে।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, বাসাভাড়া ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বাস্তবতায় শ্রমিকদের এই দাবিকে অযৌক্তিক বলার সুযোগ নেই। যাঁদের শ্রম ও ঘামে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ছে, তাঁদের জীবনমান নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও শিল্পমালিকদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু ন্যায্য দাবির আন্দোলন যখন সহিংসতা, ভাঙচুর ও উৎপাদন বন্ধের দিকে গড়ায়, তখন তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদেরই বহন করতে হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ এবং ১৭ লাখের বেশি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যে তথ্য সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। একদিকে শ্রমিকেরা মজুরি ও জীবনমানের নিশ্চয়তা চাইছেন, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ কার্যাদেশ, কর্মসংস্থান ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে। তাই এই সংকটকে কোনোভাবেই কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এদিকে, শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক গোষ্ঠী, বহিরাগত কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন থাকার অভিযোগ উঠেছে। ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পোশাকশিল্পকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা থাকলে তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। তবে, অভিযোগ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক পরিচয় বা অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের তকমা দিয়ে দমনের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এখানে সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের দাবির বাস্তবসম্মত সমাধান করতে হবে। মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সরকারের সমন্বয়ে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা জরুরি। শুধু আশ্বাস দিয়ে কিংবা কঠোর অবস্থান নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ দূর করা সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে শ্রমিক নেতাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আন্দোলনের নামে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভাঙচুর কিংবা জোরপূর্বক কারখানা বন্ধ করার মতো কর্মকাণ্ড শ্রমিকস্বার্থের পরিপন্থী। প্রকৃত শ্রমিকদের দাবিকে সামনে রেখে শান্তিপূর্ণ ও সংগঠিত আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। মালিকদেরও শ্রমিকদের প্রতি ন্যায্য আচরণ, সময়মতো মজুরি পরিশোধ এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নে আন্তরিক হতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, পোশাকশিল্পকে রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আড়ালে কেউ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সেই অজুহাতে শ্রমিকদের অধিকারও উপেক্ষা করা চলবে না।
মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি আর শিল্পের স্থিতিশীলতা কোনো বিপরীত স্রোত নয়; বরং একই ভবিষ্যতের দিকে বয়ে চলা দুটি অবিচ্ছেদ্য ধারা। যে শ্রমিকের ঘামে রপ্তানির স্বপ্ন বোনা হয়, তার জীবনেই যদি স্বস্তি না থাকে, তবে শিল্পের সমৃদ্ধিও একসময় অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই মুখোশের আড়ালে কারা শ্রমিকের ন্যায্য দাবিকে সহিংসতার আগুনে ঠেলে দিচ্ছে, তা যেমন উন্মোচন করতে হবে, তেমনি মুছে ফেলতে হবে অসন্তোষের গভীরে জমে থাকা বঞ্চনা ও বৈষম্যের ক্ষত।
সন্দেহের কুয়াশা নয়, সত্যের আলোয় হোক তদন্ত; দমনের কঠোরতা নয়, সংলাপের উদারতায় খুঁজে নেওয়া হোক সমাধানের পথ। কারণ, আগুন জ্বালিয়ে নয়, আস্থার সেতু গড়েই টিকে থাকে শিল্প, বাঁচে শ্রমিক, সমৃদ্ধ হয় দেশ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









