বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে যে কয়জন ক্ষণজন্ম পুরুষ ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে অন্ধকারের অমানিশা দূর করেছিলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। সাধারণ এক সামরিক অফিসারের জীবন থেকে শুরু করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার প্রতিটি ধাপে তিনি রেখে গেছেন তাঁর অসামান্য দেশপ্রেম এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের ছাপ।
তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন সংকট কালের সাহসী সেনাপতি এবং আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও জাতীয় কাঠামোর প্রধান কারিগর। তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক দক্ষতা বাংলাদেশকে বিশ্বমানচিত্রে এক আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার নশিপুর ইউনিয়নের বাগবাড়ী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা মনসুর রহমান ছিলেন একজন রসায়নবিদ এবং মা জাহানারা খাতুন সুগৃহিণী।
বাবার চাকরির সুবাদে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কাটে কলকাতায় এবং দেশভাগের পর করাচিতে। ১৯৫৩ সালে তিনি কাকুল পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন লাভ করেন। তাঁর পেশাদারিত্ব এবং সাহসিকতা তাঁকে সামরিক বাহিনীর অন্যতম চৌকস অফিসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। ওই সময়ই ১৯৬০ সালে দিনাজপুর শহরের মেয়ে খালেদা খানমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে তিনি অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন। যুদ্ধে দুর্ধর্ষ সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য যেসব কোম্পানি সর্বাধিক বীরত্বসূচক পুরস্কার লাভ করে, জিয়াউর রহমানের কোম্পানি ছিল এদের অন্যতম। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পাকিস্তান সরকার জিয়াউর রহমানকে হিলাল-ই-জুরাত খেতাবে ভূষিত করে। এছাড়াও জিয়াউর রহমানের ইউনিট এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য দুটি সিতারা-ই-জুরাত এবং নয়টি তামঘা-ই-জুরাত পদক লাভ করেন।
১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। সে বছরই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটাস্থিত কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে স্টাফ কোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি মেজর পদবিতে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের দায়িত্ব লাভ করেন। অ্যাডভান্সড মিলিটারি অ্যান্ড কমান্ড ট্রেনিং কোর্স নামক একটি উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পশ্চিম জার্মানিতে যান এবং কয়েক মাস ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথেও কাজ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের দায়িত্ব লাভ করেন।
জিয়াউর রহমানের জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চ কালোরাতে যখন পাকবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বর্বরোচিত অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে, তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থানরত মেজর জিয়া কালক্ষেপণ না করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁর সেই ঐতিহাসিক উক্তি ‘We Revolt’ বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ক্ষণ। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। তাঁর সেই গম্ভীর ও আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর দিকভ্রান্ত বাঙালির কাছে আশার আলো এবং যুদ্ধের অনুপ্রেরণা হয়ে দেখা দিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে সরাসরি রণক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অসামান্য বীরত্ব ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান বীরউত্তম উপাধিতে ভূষিত করে। স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের সামরিক পেশাজীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ও সুশৃঙ্খল। দেশ স্বাধীনের পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পান এবং কুমিল্লা ব্রিগেডের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন।
১৯৭৩ সালে তিনি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন এবং ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সিপাহী-জনতার বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন এবং পরবর্তীকালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্রের হাল ধরেন। ১৯৭৮ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি পান। রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান ছিল দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তিনি একদলীয় শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সকল রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন।
সংবাদপত্রের ওপর থেকে সকল কালাকানুন ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন এবং বিচার বিভাগের স্বকীয়তা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একটি স্থবির জাতিকে গতিশীল করার জন্য তিনি তাঁর বিখ্যাত ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যা ছিল আধুনিক বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি। এই ১৯ দফার মাধ্যমে তিনি খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেন। শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল দূরদর্শী।
তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষিত জাতি ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের পথে এগিয়ে নেন এবং নিরক্ষরতা দূর করতে দেশব্যাপী 'গণশিক্ষা' কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁর সময়েই শিশুদের স্কুলে ফেরাতে 'খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা' কর্মসূচির প্রাথমিক ধারণা ও বাস্তবায়ন শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে। তিনি গ্রামে গ্রামে হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
তিনি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত খালখনন কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলন। তিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ছেড়ে নিজে হাতে কোদাল তুলে নিয়ে মাঠপর্যায়ে নেমেছিলেন, যা দেশের সেচ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে এবং খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে নিয়ে যায়। তাঁর সময়েই বাংলাদেশে সবুজ বিপ্লব সফল হয়েছিল এবং তিনি প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার খাল খনন করে চাষাবাদের আওতা বাড়িয়েছিলেন। এর ফলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যঘাটতি কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা অর্জন করে।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রে তিনি বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দেন। আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি গার্মেন্টস শিল্প এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আয়ের যে ধারা আমরা দেখছি, তার পথপ্রদর্শকও ছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতির দ্বার উন্মোচন করেন এবং দেশে প্রথম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা বা ইপিজেড স্থাপনের কাজ শুরু করেন। বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতির মাধ্যমে তিনি বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করেন। বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড তাঁরই দূরদর্শী চিন্তার ফসল, যার মাধ্যমে তিনি অন্ধকার গ্রাম বাংলায় আলোর দিশা দিয়েছিলেন।
জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে তিনি এক অনন্য দর্শন প্রদান করেন, যা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নামে পরিচিত। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ধর্ম, ভাষা এবং ভৌগোলিক অবস্থান- এই তিনের সমন্বয়েই এদেশের মানুষের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ফুটে ওঠে। এই দর্শনের মাধ্যমেই তিনি বিভাজিত একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে শুরু করে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ একই পরিচয়ে পরিচিত হবে- আর তা হলো বাংলাদেশি।
রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে তিনি ইসলামি মূল্যবোধ ও ধর্মীয় চেতনার প্রতিফলন ঘটান। সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম সংযোজন করে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নেন। নারী শক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে তিনি প্রথম ক্যাবিনেট পর্যায়ে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেন এবং পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে নারীদের জন্য কোটাপ্রথা চালু করেন। তরুণ সমাজকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে তিনি যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জন্য তিনি জাতীয় শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে নতুন কুঁড়ির মতো প্রতিভা অন্বেষণমূলক কর্মসূচি চালু করেন। প্রশাসনিক সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি গ্রাম সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন এবং থানাগুলোকে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক ছিল তাঁরই মস্তিষ্কের ফসল। আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার লক্ষ্যে তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে মাইলফলক হয়ে আছে। এছাড়া ওআইসি এবং আল-কুদস কমিটিতে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে তিনি মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক দৃঢ় করেন। ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে তাঁর মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়। উত্তর-দক্ষিণ সংলাপেও তিনি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জোরালো কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর প্রভাব ছিল এতটাই যে, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন। ফিলিস্তিনের কিংবদন্তি নেতা ইয়াসির আরাফাত তাঁকে মুসলিম উম্মাহ ও মজলুম মানবতার অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত তাঁকে আধুনিক আরব-এশিয়া সম্পর্কের সেতুবন্ধন হিসেবে আখ্যা দেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার জিয়ার অর্থনৈতিক সংস্কারের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান তাঁর ব্যক্তিগত সততাকে বৈশ্বিক রাজনীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও তাঁর নেতৃত্বের স্তুতি গেয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, জিয়াউর রহমান বিশৃঙ্খল এক জাতিকে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। তাঁর কঠোর পরিশ্রমী স্বভাব এবং ব্যক্তিগত সততা তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান তাঁকে একজন ব্যবহারিক ও মাঠপর্যায়ের রাজনীতিক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপি তাঁর সম্পর্কে বলেছিল, জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা, যিনি খাদ্য সংকট ও দুর্যোগের মুখে বাংলাদেশকে আশার আলো দেখিয়েছিলেন। জাপানি ও ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁকে তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম উদীয়মান নক্ষত্র হিসেবে অভিহিত করেছিল। একজন প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে, জিয়াউর রহমান কোনো তাত্ত্বিক পণ্ডিত ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন একশন-ম্যান।
যুদ্ধের ময়দানে তিনি যেমন লড়েছেন, দেশ গঠনেও তিনি তেমনি বেলচা হাতে মাঠে নেমেছিলেন। অন্য এক ইতিহাসবিদের ভাষ্যমতে, জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করা। জিয়াউর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত মিতব্যয়ী ও সময়নিষ্ঠ। তাঁর সততা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। একজন রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। সরকারি অর্থ অপচয় রোধে তিনি কঠোর ছিলেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর দেখা যায়, তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলতে তেমন কিছুই ছিল না- একটি ভাঙা সুটকেস এবং সামান্য কিছু কাপড়ই ছিল তাঁর পার্থিব সম্পদ। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে এই মহান নেতা শাহাদাত বরণ করেন। এই মহান নেতার ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকীতে পুরো জাতি তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করছে। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে তাঁর জানাজায় উপস্থিত লক্ষ লক্ষ মানুষের জনস্রোত প্রমাণ করেছিল তিনি সাধারণ মানুষের কতটা প্রিয় ছিলেন। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তাঁকে একজন শান্তির দূত হিসেবে স্মরণ করেন।
জিয়াউর রহমান কেবল একটি নাম নয়, একটি অধ্যায়। তাঁর সততা, দেশপ্রেম ও দূরদর্শী নেতৃত্ব আজও বাংলাদেশের রাজনীতি ও উন্নয়নে অনুপ্রেরণা জোগায়। বাংলাদেশের মানচিত্র যতদিন থাকবে, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং আধুনিক বাংলাদেশের বিনির্মাণে জিয়াউর রহমানের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হবে। তিনি চলে গেলেও রেখে গেছেন এক স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন, যা আজও আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রায় চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করে। তিনি ছিলেন বীর উত্তম, তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের মহানায়ক।
লেখক : সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









