পাঁচ বছর আগে এমন প্রশ্ন কেউ করত না—তামিল সিনেমার বড় তারকারা যদি একে একে পর্দা থেকে সরে যান, তাদের জায়গা নেবেন কারা? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর কিছুটা অপ্রত্যাশিত। উত্তরটি হতে পারে—যাঁরা এতদিন ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে তারকাদের অভিনয় করিয়েছেন, তারাই।
অরুণ মাথেশ্বরনের ‘ডিসি’ ছবিতে লোকেশ কানাগরাজের অভিনয় অন্তত সেই সম্ভাবনাই সামনে এনেছে। অভিনয়ে তিনি হয়তো প্রশিক্ষিত অভিনেতাদের মতো নিখুঁত নন, কিন্তু পর্দায় তাঁর উপস্থিতি নজর কাড়ে। বিশেষ করে তাঁর নীরবতা, চোখের অভিব্যক্তি এবং দৃশ্যের মধ্যে সঠিক মুহূর্তে থেমে যাওয়ার ক্ষমতা আলাদা করে চোখে পড়ে।
কারণও আছে। একজন পরিচালক বছরের পর বছর অভিনেতাদের অভিনয় দেখেন, তাদের কোথায় থামতে হবে, কোথায় চুপ থাকতে হবে, কখন সংলাপ বলতে হবে—এসব ঠিক করেন। ফলে তিনি যখন নিজেই অভিনয়ে আসেন, তখন দৃশ্যের ভেতরের কাঠামোটি খুব ভালো বোঝেন। একজন অভিনেতা ভাবেন তার অভিনয় দর্শকের কাছে কেমন দেখাবে। একজন পরিচালক ভাবেন পুরো ফ্রেমটি দর্শকের কাছে কেমন অনুভূতি তৈরি করবে। এই পার্থক্যই অনেক সময় পরিচালকদের অভিনয়কে আকর্ষণীয় করে তোলে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ প্রাদীপ রঙ্গনাথন। ‘লাভ টুডে’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সঠিক অভিনেতা খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি বড় সাফল্য পায়। এরপর ‘ড্রাগন’ এবং `ডুড’-এর মতো ছবিতে প্রধান অভিনেতা হিসেবে তার সাফল্য প্রমাণ করে, পরিচালকেরাও বাণিজ্যিক নায়ক হয়ে উঠতে পারেন।
এর আগে শশিকুমারও একই পথ দেখিয়েছেন। ২০০৮ সালে ‘সুব্রামানিয়াপুর’ ছবিতে তিনি লেখক, পরিচালক এবং অভিনেতা—তিন ভূমিকাতেই কাজ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে অভিনয়েও তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। একইভাবে ‘টোরিস্ট ফ্যামিলি’-এর পরিচালক অভিষান জীবিন্থ অভিনয়ের দিকেও এগিয়েছেন। কেন করুণাসও পরিচালনা ও অভিনয়—দুই ক্ষেত্রেই কাজ করছেন।
তামিল সিনেমার বর্তমান তারকা-সংকটও গুরুত্বপূর্ণ। বিজয় এখন রাজনীতিতে সক্রিয় এবং সিনেমা থেকে সরে গেছেন। অজিত কুমারও মোটরস্পোর্টস নিয়ে ব্যস্ত। রজনীকান্তের বয়স ৭৫, কমল হাসানও আগের মতো নিয়মিত অভিনয় করছেন না। সূরিয়া বেছে বেছে ছবি করছেন। ধনুষ একই সঙ্গে একাধিক ভাষার সিনেমায় কাজ করছেন। ফলে নিয়মিত বড় তারকাদের উপস্থিতির জায়গায় একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পরিচালক-অভিনেতাদের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সাধারণ চেহারা ও স্বাভাবিক উপস্থিতি। তাঁরা পর্দায় সবসময় অজেয় নায়ক হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন না। তারা ভুল করতে পারেন, দুর্বল হতে পারেন, অসহায় হয়ে বসে থাকতে পারেন। আর এই মানবিকতাই দর্শকের কাছে তাঁদের আরও পরিচিত করে তোলে।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে পরিচালকরা অভিনেতাদের জায়গা নিয়ে নেবেন। তারকার জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘদিনের দর্শক-সম্পর্কের কোনো সহজ বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে নতুন তারকারা আসবেনই।
তবে এই সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। তামিল সিনেমার বড় তারকারা যখন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন, তখন ক্যামেরার পেছনের মানুষগুলো সামনে এসে নিজেদের নতুন পরিচয় তৈরি করছেন। লোকেশ কানাগরাজ তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম হতে পারেন। আর এই পরিবর্তন দেখিয়ে দিচ্ছে—তামিল সিনেমার ভবিষ্যৎ নায়ক হয়তো সবসময় মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি নন; কখনও কখনও তিনি ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিও হতে পারেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









