মঞ্চে আলো জ্বলে। হাজার মানুষ একসঙ্গে গান গায়। কিছু সময়ের জন্য মনে হয়, পৃথিবীর সব ভেদাভেদ যেন দরজার বাইরে পড়ে আছে। এখানে শুধু সুর, আনন্দ আর একসঙ্গে থাকার অনুভূতি। কিন্তু সেই দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকে আরেকটি প্রশ্ন—কোন কথা এই আনন্দের মধ্যে বলা যাবে, আর কোন কথা বলা যাবে না?
এড শিরানের কনসার্টে ম্যাকলমোরের মুখ থেকে যখন উচ্চারিত হলো, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, তখন সেই প্রশ্নটি হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে উঠল। জনপ্রিয় সংস্কৃতিকে আমরা প্রায়ই রাজনীতি থেকে দূরের এক নিরাপদ জায়গা হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। গান, সিনেমা, বিনোদন—এসব যেন বাস্তব জীবনের সংঘাত থেকে সাময়িক আশ্রয়। কিন্তু সেই আশ্রয়েরও কিছু অদৃশ্য দেয়াল থাকে। কে কথা বলবে, কী বলবে, কোথায় বলবে—তারও নিয়ম আছে।
ম্যাকলমোর সেই দেয়ালের কাছে গিয়ে কথা বলেছিলেন।
এরপর যা ঘটেছে, তা শুধু একজন শিল্পীর একটি কনসার্টে থাকা বা না-থাকার ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না। সুসান সারান্ডন, মেলিসা বাররেরা, ক্নিপ্যাপসহ আরও অনেক শিল্পী এর আগে ফিলিস্তিন নিয়ে কথা বলে পেশাগত চাপের মুখে পড়েছেন। রজার ওয়াটার্সও এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। সংস্কৃতির জগতে যেন সেই পুরোনো কথাটিই ফিরে আসে—‘মাংস না খেলে পুডিংও পাবে না।’ কিন্তু তাঁদের কেউ কেউ মাংস খাননি। অর্থাৎ, শর্ত মেনে নীরবও থাকেননি।
ম্যাকলমোরের ক্ষেত্রেও শাস্তি এল খুব দ্রুত। গিলেট স্টেডিয়ামের মালিক রবার্ট ক্রাফটের হস্তক্ষেপের পর তাকে এড শিরানের সফরের বাকি আটটি কনসার্ট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে ফিনিয়াস, লুকাস গ্রাহাম, অ্যারন রো এবং বেওগার সদস্যরা সরে দাঁড়ান। তাঁরা আর সেই মঞ্চে উঠতে চাননি।
শিরান অবশ্য বলেছেন, ম্যাকলমোরকে সরানোর সিদ্ধান্ত তার নয়, আয়োজকের। তার বক্তব্য, তিনি এমন কনসার্ট চান যেখানে বিভাজনের বদলে ঐক্য, রাজনীতির বদলে মানুষের একসঙ্গে থাকার আনন্দ সামনে থাকবে।

কথাটি শুনতে সুন্দর। কিন্তু সুন্দর কথারও একটি ছায়া থাকে।
কারণ ‘রাজনীতি নয়’ বলার মুহূর্তেই ঠিক করে দেওয়া হয়—কোন বিষয়টি রাজনীতি, আর কোনটি কেবল মানবিকতার কথা। একটি গানের মাঝখানে প্রেমের কথা বলা স্বাভাবিক; কিন্তু গাজার মানুষের মৃত্যু নিয়ে কথা বললে সেটি রাজনৈতিক হয়ে যায়। মঞ্চ তখন আর শুধু মঞ্চ থাকে না। সেখানে নীরবতারও একটি অর্থ তৈরি হয়।
শিরান তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি তার পেশাগত মঞ্চকে রাজনীতির জন্য ব্যবহার করেন না। তার শ্রোতাদের মধ্যে তরুণ ও শিশু রয়েছে, তারা নানা পটভূমি থেকে আসেন।
‘শিশু’ শব্দটি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ শিশুরাই যেন প্রাপ্তবয়স্কদের তৈরি করা এই সীমার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রহরী। বলা হয়, তাদের সামনে রাজনীতি নয়—শুধু আনন্দ থাকা উচিত। কিন্তু গাজার শিশুরা কি সেই আনন্দের বাইরে? তাদের নিরাপত্তা, তাদের জীবন, তাদের ভবিষ্যৎ—এসব কি রাজনীতির বাইরে কোনো আলাদা ঘরে রাখা যায়?
ম্যাকলমোরকে মঞ্চ থেকে সরানোর দাবিতে ইসরায়েলি-আমেরিকান কাউন্সিল, গায়িকা পিঙ্কসহ আরও কয়েকজনও আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, তার বক্তব্য ইহুদি বা ইসরায়েলপন্থী দর্শকদের মধ্যে অনিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
নিরাপত্তার প্রশ্নটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তখন আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে: গাজার শিশু ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা কেন একই গুরুত্বে উচ্চারিত হবে না?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ ‘নিরাপত্তা’, ‘ঘৃণা’ বা ‘পেশাদারিত্ব’—এসব শব্দ নিরপেক্ষ মনে হলেও বাস্তবে কে এগুলোর সংজ্ঞা দিচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। মঞ্চের মালিক, আয়োজক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, শিল্পী এবং দর্শকের ক্ষমতা এক নয়। ফলে একই কথা একেকজনের মুখে একেক রকম ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আরও একটি পথ আছে—প্রশ্নটিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। ‘শিরানের কি কোনো বিকল্প ছিল?’ ‘ম্যাকলমোর কি ইহুদিবিদ্বেষী?’ ‘স্টেডিয়ামের মালিক কি ঠিক করবেন না, তাঁর মঞ্চে কে উঠবেন?’
এসব প্রশ্নের প্রত্যেকটির আলাদা উত্তর থাকতে পারে। কিন্তু এগুলো যখন গাজার মানুষের প্রশ্নকে আড়াল করে, তখন মূল বিষয়টি ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। আমরা তখন বিচারকের আসনে বসি। কে ঠিক, কে ভুল, কে ভদ্র, কে পেশাদার—এসব নিয়ে আলোচনা করি। অথচ যে মানুষগুলোর জীবন নিয়ে কথা শুরু হয়েছিল, তারা আবার অন্ধকারে চলে যায়।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো ক্ষমতা কীভাবে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং মানুষকে একটি নির্দিষ্ট আচরণের ভেতরে পরিচালিত করে, তা নিয়ে লিখেছিলেন। রাখালের মতো ক্ষমতা—যেখানে সবাইকে আলাদা করে দেখা হয়, আবার সবাইকে একটি পাল বা গোষ্ঠীর অংশ হিসেবেও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
সংস্কৃতির জগতেও তেমন এক অদৃশ্য রাখাল থাকতে পারে। তাকে সব সময় সেন্সর হিসেবে দেখা যায় না। কখনো সে আয়োজক, কখনো বিজ্ঞাপনদাতা, কখনো মঞ্চের মালিক, কখনো দর্শকের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার হিসাব। ফলে কাউকে সরিয়ে দেওয়ার আদেশ না এলেও শিল্পী বুঝে যান—কোন পথে গেলে পথটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ম্যাকলমোরের ক্ষেত্রে সেই দরজাটি হয়তো অর্থ ও মঞ্চের দরজা। তিনি গান গাইতে পারেন, কথা বলতে পারেন; কিন্তু একটি নির্দিষ্ট জনপরিসরে তার প্রবেশের সুযোগ কমে যায়। এই অর্থে ‘ডিপ্ল্যাটফর্মিং’ কেবল একটি অনুষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়া নয়; এটি জনপরিসরের একটি অংশ হারানোও হতে পারে।
তবে শাস্তির মাত্রা সবার জন্য এক নয়। একজন ধনী ও নাগরিক শিল্পী অর্থ, পেশাগত সুযোগ বা ব্র্যান্ডের ক্ষতি হয়তো সামলে নিতে পারেন। কিন্তু একজন অভিবাসী, রাষ্ট্রহীন বা উপনিবেশিত মানুষের ক্ষেত্রে একই ধরনের বক্তব্য আরও কঠিন পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কারও জন্য দরজা বন্ধ হয়; কারও জন্য খুলে যেতে পারে কারাগারের দরজা।
মোহাম্মদ এল-কুর্দ তার ‘পারফেক্ট ভিকটিমস: অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব অ্যাপিল’ লেখায় দেখিয়েছেন, গাজার ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পশ্চিমা মধ্যস্থতাকারী কিংবা ইসরায়েলি ও ইহুদি কণ্ঠের অনুমোদন অনেক সময় প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যেন একজন ফিলিস্তিনির নিজের কথা বলার চেয়ে অন্য কারও মুখে সেই কথার প্রতিধ্বনি বেশি সহজে শোনা যায়।
ম্যাকলমোর সেই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তিনি ফিলিস্তিনি নন। তার কণ্ঠ তাই এমন এক শ্রোতৃমণ্ডলীর কাছে পৌঁছাতে পারে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের কণ্ঠ সব সময় সমানভাবে পৌঁছায় না।
কিন্তু এই জায়গাতেই গল্পটি আরও অন্ধকার হয়ে ওঠে।
ফিলিস্তিনি কবি ও শিক্ষক রেফাত আলারিরের কণ্ঠ থেমে গেছে। ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর গাজায় তিনি নিহত হন। তিনি ‘উই আর নট নাম্বার্স’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন—যে সংগঠন ফিলিস্তিনি তরুণ লেখক ও চিন্তকদের নিজেদের গল্প নিজেদের ভাষায় বলার সুযোগ করে দিতে কাজ করত। মানুষকে শুধু সংখ্যা হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবেই দেখার চেষ্টা ছিল সেই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে।
ম্যাকলমোর মঞ্চ হারিয়েছেন। আলারির হারিয়েছেন জীবন।
এই দুই ঘটনার মাত্রা এক নয়। একজনের ক্ষেত্রে শাস্তি এসে থেমেছে অর্থ, অনুষ্ঠান ও পেশাগত সুযোগে। অন্যজনের ক্ষেত্রে কথা বলার পৃথিবীই শেষ হয়ে গেছে। তবু দুটির মধ্যে একটি অস্বস্তিকর যোগসূত্র রয়েছে: ফিলিস্তিনের কথা বলা কতটা মূল্য দাবি করে, তা বক্তার পরিচয় ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে।
একদিন হয়তো এমন সময় আসবে, যখন একটি অন্যায়ের নাম উচ্চারণ করা আর সাহসের ব্যাপার থাকবে না। তখন অনেকেই বলবেন, তারা তো সব সময়ই এর বিরুদ্ধে ছিলেন। ওমর এল-আকাদের কথায়, এমন এক দিন আসতে পারে যখন কোনো কিছুকে তার প্রকৃত নামে ডাকার জন্য আর ব্যক্তিগত মূল্য দিতে হবে না—আর তখন সবাই দাবি করবে, তারা শুরু থেকেই তার বিরোধিতা করেছিল।
কিন্তু ইতিহাসের পথ একটু অন্য রকম। যে মানুষটি ঝুঁকি থাকা অবস্থায় কথা বলেন, তার কণ্ঠ তখনই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। পরে যখন কথা বলা নিরাপদ হয়ে যায়, তখন সেই কথার মূল্যও বদলে যায়।
একটি মঞ্চে হাজার মানুষ একসঙ্গে গান গাইতে পারে। আলো নিভে গেলে সবাই বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু কোনো কোনো শব্দ আলো নিভে যাওয়ার পরও থেকে যায়।
‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ তেমনই একটি শব্দ।
প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু ম্যাকলমোরকে নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, এমন কোন ঐক্য আমরা চাই, যেখানে সবাই আনন্দ করতে পারে, কিন্তু কেউ কেউ তাদের মানুষের কথা বলতে পারে না? কোন শান্তির জন্য নীরবতা দরকার? আর কোন নীরবতা আসলে শান্তি নয়—শুধু একটি দেয়াল?
দেয়াল যতই মসৃণ হোক, তার ওপাশে যদি মানুষের কান্না থাকে, একদিন না একদিন শব্দটি এপাশে আসবেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









