বাণিজ্যযুদ্ধের মঞ্চে অস্ত্র দেখা যায় না। থাকে শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তি আর সংখ্যার সারি। কিন্তু এসব সংখ্যার পেছনেও থাকে ক্ষমতার রাজনীতি—কে কাকে নির্ভরশীল করে রাখবে, কে বিশ্ববাজারের পথ নিয়ন্ত্রণ করবে, আর কার অর্থনীতি অন্য দেশের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে।
এই হিসাবের কেন্দ্রেই এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্র।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের আগে প্রশ্নটি তাই শুধু কত শতাংশ শুল্ক বসেছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পের বহু প্রচারিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্যনীতি বাস্তবে কতটা বদল আনতে পেরেছে।
সংখ্যাগুলো বেশ নির্মম। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পণ্যবাণিজ্য ছিল প্রায় ৫৮৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা কমে প্রায় ৪১৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে আমদানি কমিয়েছে, ফলে চীনের সঙ্গে তার পণ্যবাণিজ্য ঘাটতিও ২৯৭ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে প্রায় ২০৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
কিন্তু এখানেই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি শুরু।
চীন থেকে কম পণ্য কেনা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাণিজ্যঘাটতি কমে যাওয়া নয়। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পণ্যবাণিজ্য ঘাটতি বরং প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়; ২০২৪ সালের তুলনায় তা সামান্য বেড়েছে।
অর্থাৎ একটি দরজা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু পণ্যপ্রবাহ থামেনি। চীনা পণ্যের একটি অংশ অন্য সরবরাহশৃঙ্খল ও বাজারের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাচ্ছে, আর চীন নিজেও তার বিকল্প বাজার দ্রুত বাড়িয়েছে। নিউইয়র্ক ফেডের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাণিজ্যঘাটতি প্রায় অপরিবর্তিত থাকার বিপরীতে বিশ্বের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে উঠেছে।
এটাই ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
২০২৫ সালের শুরুতে চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন যে সংঘাত শুরু করেছিল, এপ্রিল নাগাদ তা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছায়। চীনও পাল্টা শুল্ক ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। পরে দুই দেশ সাময়িক সমঝোতায় গেলেও সংঘাতের চরিত্র বদলায়নি। এখন শুল্কের পাশাপাশি লড়াই চলছে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।

চীনের হাতে আছে এমন এক সম্পদ, যার গুরুত্ব তেল বা গ্যাসের মতোই কৌশলগত: বিরল মাটির খনিজ। এসব খনিজ বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে উন্নত ইলেকট্রনিকস ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অন্য অস্ত্র—উন্নত চিপ ও চিপ তৈরির প্রযুক্তি। ফলে বাণিজ্যযুদ্ধ ধীরে ধীরে প্রযুক্তির যুদ্ধেও পরিণত হয়েছে।
কিন্তু চীনের অর্থনীতি শুধু আমেরিকার বাজারের ওপর দাঁড়িয়ে নেই।
২০২৫ সালে চীনের পণ্য রপ্তানি ৬.১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩.৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়ে ১৪ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৯ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীনের রপ্তানি আরও ১৩.৪ শতাংশ বেড়েছে। জানুয়ারি-জুলাইয়ে চীন-আসিয়ান বাণিজ্যও ২৪.৭ শতাংশ বেড়ে ৭৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
চীন এখন শুধু সস্তা পণ্যের কারখানা নয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি ও উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য নিয়ে সে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বাজারে আরও গভীরে ঢুকছে। আগস্ট পর্যন্ত চীনের পণ্যবাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রায় ৮২০ বিলিয়ন ডলার—পুরো ২০২৫ সালের প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তের কাছাকাছি।
তাহলে বাণিজ্যযুদ্ধে কে জিতছে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে ‘জয়’ শব্দটির অর্থ ঠিক করা দরকার।
যদি লক্ষ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কমানো, তাহলে ট্রাম্পের শুল্কনীতি একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাণিজ্যঘাটতি কমানো এবং চীনের রপ্তানিশক্তিকে দুর্বল করা, তাহলে পরিসংখ্যান অনেক বেশি জটিল ছবি দেখায়। যুক্তরাষ্ট্রের চীন-ঘাটতি কমেছে মূলত চীন থেকে আমদানি কমার কারণে; যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি চীনে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে প্রায় ১৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে এবং চীনে রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। ফলে সাত মাসেই পণ্যবাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯১ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে ওয়াশিংটন শুল্ক বাড়িয়েছে, বেইজিং বিকল্প বাজার খুঁজেছে। ওয়াশিংটন প্রযুক্তির দরজা সংকুচিত করেছে, বেইজিং নিজের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহশৃঙ্খলকে চীন থেকে দূরে সরাতে চাইছে; চীন একই সময়ে নিজস্ব শিল্পভিত্তি ও নতুন বাজারকে আরও শক্ত করছে।
এই সংঘাতের আরেকটি সত্য সাধারণত শিরোনামের আড়ালে থাকে। শুল্কের খরচ শেষ পর্যন্ত কেবল যে রপ্তানিকারক বহন করে, তা নয়; আমদানিকারক, ব্যবসা এবং ভোক্তারাও তার অংশ বহন করতে পারে। অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন ‘বিদেশি পণ্যের ওপর কর’ ঘোষণা করে, তার অর্থনীতির ভেতরেও সেই করের ঢেউ পৌঁছায়।
তাই ট্রাম্প-সি বৈঠকের টেবিলে বসবে শুধু দুটি রাষ্ট্র নয়; বসবে দুটি ভিন্ন অর্থনৈতিক মডেল, দুটি শিল্পব্যবস্থা এবং বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণা।
একসময় যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল বাজারের শক্তি দিয়ে চীনকে নিজের নিয়মে আনতে পারবে। এখন চীনও সেই বাজারের শক্তিকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করছে। আর বিশ্ব—যে বিশ্বকে একসময় একক অর্থনৈতিক কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরতে দেখা যেত—ধীরে ধীরে বহু কেন্দ্রের দিকে সরে যাচ্ছে।
বাণিজ্যযুদ্ধ তাই শুধু শুল্কের যুদ্ধ নয়। এটি বিশ্বব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের লড়াই।
এবং এই লড়াইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো ‘কে জিতল’ নয়। বরং—কে নিজের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বাজারের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারল; আর সেই নিয়ন্ত্রণের মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দিল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









