কিছু ফুটবল-গল্পের শুরু হয় মাঠে। কিছু গল্প শুরু হয় তারও আগে—একটি গাড়ির দরজা খোলার শব্দে, একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময়, কিংবা এমন একজন মানুষের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে, যিনি পরে আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠবেন।
কিলিয়ান এমবাপ্পের গল্পটা তেমনই।
পনেরো বছর আগে, বয়স তখন মাত্র ১৩ বা ১৪। তরুণ এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদের যুব দলের অনুশীলন দেখতে গিয়েছিলেন। তাকে ব্যক্তিগতভাবে গাড়িতে তুলে নিয়েছিলেন জিনেদিন জিদান। সেই সময় জিদান ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি—মাঠের মানুষ, ক্লাবের প্রতীক। আর এমবাপ্পে ছিলেন এমন এক কিশোর, যার সামনে তখনও পুরো ফুটবল-জীবন পড়ে আছে।
আজ দৃশ্যটা বদলে গেছে। জিদান এখন ফ্রান্স জাতীয় দলের কোচ। আর তার দলের সবচেয়ে বড় তারকা এমবাপ্পে।
“মনে হয় যেন সিনেমার গল্প,” বলেছেন এমবাপ্পে। “কিন্তু এটা সত্যি, বাস্তব।”
ফ্রান্সের জন্যও এটি একটি নতুন গল্পের শুরু। দীর্ঘ ১৪ বছর জাতীয় দলের দায়িত্বে থাকার পর দিদিয়ের দেশম অধ্যায় শেষ করেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে সেমিফাইনালে হারের পর দায়িত্ব ছেড়েছেন তিনি। তার জায়গায় এসেছেন জিদান—ফরাসি ফুটবলের আরেক কিংবদন্তি, যার সঙ্গে এমবাপ্পের সম্পর্ক শুরু হয়েছিল খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং এক কিশোরের স্বপ্নের দিনগুলোতে।
এখন সেই সম্পর্কের নতুন পরীক্ষা।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ইজমিতে তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে জিদানের অধীনে ফ্রান্সের নতুন যাত্রা শুরু হচ্ছে। সামনে ইউরো ২০২৮। প্রস্তুতির জন্য সময় আছে প্রায় দুই বছর। নেশনস লিগে তুরস্ক ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচ এবং ইতালি ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে ঘরের মাঠের ম্যাচ—এই চার ম্যাচের মধ্য দিয়েই নতুন দলটির কাঠামো তৈরি হবে।

এমবাপ্পে জানেন, পরিবর্তনটা শুধু কোচের নাম বদলানোর নয়। তার নিজের জাতীয় দলের অভিজ্ঞতাতেও একটি যুগ শেষ হয়েছে।
“আমি শুধু দেশমের অধীনেই খেলেছি,” বলেছেন তিনি। “এখন নতুন একটি প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। আমাদের হাতে দুই বছর সময় আছে। এটা নতুন যুগ। আশা করি সবকিছু ভালোভাবেই এগোবে।”
ফুটবলে ‘নতুন যুগ’ কথাটা খুব সহজেই বলা যায়। কিন্তু তার অর্থ বোঝা যায় মাঠে। নতুন কোচের ধারণা, নতুন কৌশল, নতুন দায়িত্ব—আর পুরোনো সাফল্যের সঙ্গে নতুন প্রত্যাশার সংঘর্ষ। ফ্রান্সের মতো দলের ক্ষেত্রে পরিবর্তন কখনোই কেবল পরিবর্তন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে পরীক্ষা।
এমবাপ্পের নিজের সময়টাও সহজ যাচ্ছে না।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মৌসুমের শুরুটা তার ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত—সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে আট ম্যাচে আট গোল। কিন্তু গোলের এই ধারার মাঝেও এসেছে একটি ধাক্কা। রোববার নগর প্রতিদ্বন্দ্বী আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে ২-১ গোলে হেরেছে রিয়াল। সেই ম্যাচে এমবাপ্পে গোল পাননি।
আর এই হারের ফলে লিগের শিরোপাধারী বার্সেলোনার চেয়ে রিয়াল এখন ছয় পয়েন্ট পিছিয়ে।
এই মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নিয়েছেন হোসে মরিনিও। তার সামনে বড় কাজ—দুই মৌসুমের প্রধান ট্রফিহীনতা শেষ করা। কিন্তু মাদ্রিদ ডার্বির হার সেই পথটাকে আরও কঠিন করে দিয়েছে।
মরিনিও ম্যাচের পর রেফারিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এমবাপ্পে অবশ্য সেই বিতর্কে যেতে চাননি।
“আমারও কিছু ভাবনা আছে,” বলেছেন তিনি, “কিন্তু সেগুলো নিজের কাছেই রাখব।”
রেফারও মানুষ—ভুল হতে পারে। এমবাপ্পের কথায় তাই বিতর্কের চেয়ে ছিল সংযম। তার কাছে সামনে তাকানোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি হার নিয়ে যতক্ষণ আলোচনা করা যায়, ততক্ষণে পরের ম্যাচ এসে যায়।
আর এবার সেই পরের ম্যাচটি ফ্রান্সের।
জাতীয় দলের জার্সিতে এমবাপ্পের সামনে তাই একই সঙ্গে দুটি নতুন বাস্তবতা। একদিকে রিয়াল মাদ্রিদে ট্রফি ফেরানোর চাপ, অন্যদিকে জিদানের অধীনে ফ্রান্সকে নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব।
জিদানকে তিনি চেনেন অনেক আগে থেকে—সেই সময় থেকে, যখন তিনি ছিলেন কিশোর এবং স্বপ্ন দেখতেন রিয়াল মাদ্রিদের অনুশীলন মাঠে পৌঁছানোর। এখন সেই মানুষটিই তাকে জাতীয় দলের হয়ে নতুন স্বপ্ন দেখাবেন।
ফুটবলে সময় কখনো সরলরেখায় হাঁটে না। পনেরো বছর আগে যে গাড়িতে একজন কিংবদন্তি এক কিশোরকে অনুশীলনে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার অনেক পরে সেই কিশোরই হয়ে উঠেছে ফ্রান্সের মুখ। আর সেই কিংবদন্তি এখন তার কোচ।
গল্পটা তাই সত্যিই সিনেমার মতো।
তবে সিনেমায় পরের দৃশ্যের চিত্রনাট্য আগে থেকে লেখা থাকে। ফুটবলে থাকে না। সেটি লিখতে হয় মাঠে—প্রতিটি পাসে, প্রতিটি গোলের সুযোগে, প্রতিটি হারে এবং শেষ পর্যন্ত ট্রফিতে।
এমবাপ্পে সেটিই জানেন। তাই তার কথাতেও আছে এক ধরনের সতর্কতা: মানুষ যা খুশি বলুক, এখন কাজ করতে হবে আরও বেশি। উত্তেজনা ফিরিয়ে আনতে হবে। আর ট্রফি জিততে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









