একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার কবিতা, নাটক, ছবি ও জীবনী থেকে আমরা তাকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করি। কিন্তু কখনো কখনো এই পুনর্গঠন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ মানুষটি যা লিখে গেছে, তার চেয়েও বিস্ময়কর হতে পারে তার উপস্থিতি—সে ঘরে ঢুকলে বাতাসের যে সামান্য পরিবর্তন ঘটে, তার কোনো জীবনীতে যার উল্লেখ নেই।
ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার ক্ষেত্রে সম্ভবত এমনই ঘটেছিল।
লুই বুনুয়েল তার স্মৃতিচারণে একটি অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। লোরকার কবিতা বা নাটক নিয়ে তিনি কথা বলবেন না। তিনি কথা বলবেন মানুষটিকে নিয়ে। ছাত্রজীবনে মাদ্রিদের রেসিদেনসিয়া দে এস্তুদিয়ান্তেসে তাদের যে বছরগুলো কেটেছিল, সেখানকার লোরকাকে মনে করে বুনুয়েল লিখেছিলেন, ‘আমি তার নাটক বা কবিতার কথা বলছি না, তাকে নিয়ে বলছি।’ তার কাছে লোরকা ছিলেন ‘মাস্টারপিস’—একজন মানুষ, যিনি পিয়ানোয় বসে মুহূর্তে কিছু সৃষ্টি করতে পারতেন, কোনো দৃশ্য অভিনয় করে ফেলতে পারতেন, কিংবা কেবল উচ্চস্বরে কিছু পড়ে শোনাতেই চারপাশের জগতকে বদলে দিতে পারতেন। বুনুয়েলের ভাষায়, তার মধ্যে ছিল আবেগ, আনন্দ ও যৌবন। ‘তিনি ছিলেন একটি শিখার মতো।’
এই স্মৃতি একা বুনুয়েলের নয়।
সালভাদর দালি, যিনি একই রেসিদেনসিয়ায় লোরকার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, বহু বছর পরও সেই সাক্ষাতের অভিঘাত ভুলতে পারেননি। তিনি লোরকার মধ্যে দেখেছিলেন এক সম্পূর্ণ ‘কাব্যিক ঘটনা’, যা কেবল কাগজে লেখা কবিতা নয়—জীবন্ত শরীরের মধ্যে যার রূপান্তর ঘটেছিল। দালি নিজেও এমন এক শিল্পী ছিলেন যার উপস্থিতি অন্য কারও আলো সহজে সহ্য করে না। তবু লোরকার ব্যক্তিত্ব তাকে বিস্মিত করেছিল। তাদের সম্পর্ক ছিল তীব্র, সৃজনশীল এবং জটিল; কিন্তু সেই জটিলতার মধ্যেও লোরকার স্বাতন্ত্র্য অস্বীকার করার উপায় ছিল না।
হর্হে গিয়েনের স্মৃতিতে বিষয়টি আরও সরল। লোরকার পাশে থাকলে যেন ঘরের তাপমাত্রা বদলে যেত। না গরম, না ঠান্ডা—‘সেটা ছিল ফেদেরিকো।’
এই একটি বাক্য হয়তো লোরকার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অনেক জীবনীগ্রন্থের চেয়ে বেশি কিছু বলে। কারণ লোরকাকে বোঝার আগে তার বিখ্যাত বইগুলোর নাম মনে করার প্রয়োজন নেই—‘ব্লাড ওয়েডিং’, ‘ইয়ের্মা’ কিংবা ‘দ্য হাউস অব বের্নার্দা আলবা’। প্রথমে মনে করা যাক সেই মানুষটিকে, যিনি ঘরে প্রবেশ করলেই ঘরে অর্থ বদলে যেত।

পেদ্রো সালিনাসের স্মৃতিও প্রায় একই রকম। লোরকার প্রাণশক্তি, চাঞ্চল্য, অস্থিরতা—তিনি যেখানেই যেতেন, সেখানেই যেন ছড়িয়ে পড়ত। তাকে আসতে দেখার আগেই তার উপস্থিতি টের পাওয়া যেত। তিনি চলে যাওয়ার পরও তার হাসি, কণ্ঠ, কথাবার্তার প্রতিধ্বনি ঘরটিতে থেকে যেত। কখনো এমনও হতো, কেউ হঠাৎ প্রশ্ন করত—ফেদেরিকো কি সত্যিই চলে গেছে? এটাই লোরকার আকর্ষণ। একজন কবির কবিতা পাঠ করা যায়; একজন নাট্যকারের নাটক মঞ্চস্থ করা যায়; কিন্তু একজন মানুষের উপস্থিতিকে পুনরায় সৃষ্টি করা যায় না।
পাবলো নেরুদা ১৯৩৭ সালে, লোরকার হত্যার মাত্র এক বছর পর, তাকে স্মরণ করেছিলেন আরেকটি অসাধারণ উপমায়। ‘তিনি গিটারের মতোই জনপ্রিয় ছিলেন।’ এই বাক্যে লোরকার শিল্পের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তিনি একই সঙ্গে অভিজাত ও লোকজ, আধুনিক ও ঐতিহ্যনির্ভর। তার কবিতায় গঙ্গোরা যেমন ছিলেন, তেমনি ছিল ফ্লামেঙ্কোর মাটি; একদিকে ইউরোপীয় আধুনিকতার স্পন্দন, অন্যদিকে আন্দালুসিয়ার বহু পুরোনো সুর। এই দ্বৈততা হয়তো তার শিল্পের সবচেয়ে স্থায়ী বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। লোরকা সংস্কৃতিকে কোনো জাদুঘরে রাখা মৃত বস্তু হিসেবে দেখেননি। তিনি ঐতিহ্যকে নিজের রক্তের ভেতর দিয়ে নতুন করে প্রবাহিত করেছিলেন।
কিন্তু আনন্দময়, দীপ্তিমান এই মানুষটির আরেকটি মুখ ছিল—যেটি সবার সামনে দেখা যেত না। ভিসেন্তে আলেইক্সান্দ্রে তাকে মনে রেখেছিলেন ‘ঝিনুকের মতো কোমল’ বলে। কিন্তু সেই কোমলতার মধ্যে ছিল গভীর প্রেম ও যন্ত্রণার ইতিহাস। লোরকার হাসি, প্রাণচাঞ্চল্য কিংবা সামাজিক উপস্থিতির আড়ালে যে মানুষটি ভালোবাসত এবং কষ্ট পেত, আলেইক্সান্দ্রে তাকে কাছ থেকে দেখেছিলেন। গ্রানাদায় ফিরে যাওয়ার কিছুদিন আগে লোরকা তাকে তার বিখ্যাত ‘সনেটস অব ডার্ক লাভ’-এর কয়েকটি কবিতা শুনিয়েছিলেন। সেই কবিতাগুলোয় যে তীব্রতা ছিল, তা লোরকার প্রকাশ্য ব্যক্তিত্বের চেয়ে সম্পূর্ণ অন্য এক প্রকাশ—
আমি আমার দুঃখ কাঁদতে চাই
আর তোমাকে বলছি, যাতে তুমি আমাকে ভালোবাসো।
আর তুমি আমার জন্য কাঁদবে
রাতের পাখিদের গানে—
ছুরি, চুম্বন আর তোমাকে নিয়ে।
এই কবিতার লোরকা আর সেই পিয়ানো বাজানো, হাসিখুশি, ঘর ভরিয়ে রাখা লোরকা—দুজন কি আলাদা মানুষ? সম্ভবত নয়। বরং একজন আরেকজনকে সম্পূর্ণ করে। মানুষের মধ্যে আনন্দ ও বেদনা পাশাপাশি থাকে; কখনো একটি অন্যটির ছদ্মবেশ নেয়। লোরকার মৃত্যুও শেষ পর্যন্ত তার স্মৃতিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। সময় তাকে বইয়ের পাতায়, আলোকচিত্রে এবং হত্যার ইতিহাসে স্থির করে দিয়েছে। কিন্তু যারা তাকে সত্যিই চিনতেন, তারা বইয়ের কথা যতটা বলেছেন, তার চেয়ে বেশি বলেছেন তার কণ্ঠ, আবৃত্তি, পিয়ানো, হাসি, মেজাজের ওঠানামা এবং তার সরব উপস্থিতির কথা।
এখানে ইতিহাসের একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিহাস আছে। আমরা সাধারণত মানুষকে তার কাজ দিয়ে স্মরণ করি। লোরকার ক্ষেত্রে তার কাজ এত অসাধারণ যে, স্বাভাবিকভাবেই আমরা ধরে নিই—তার কবিতা ও নাটকই তার সবচেয়ে সত্য পরিচয়। অথচ তার বন্ধুদের স্মৃতিতে অন্য একটি লোরকা বেঁচে আছেন—যিনি কোনো বইয়ের পাতায় সম্পূর্ণ ধরা পড়েননি। একজন কবি কী লিখেছিলেন, তা ইতিহাস সংরক্ষণ করতে পারে। কিন্তু তিনি যখন একটি ঘরে ঢুকতেন, তখন ঘরের বাতাস কীভাবে বদলে গিয়েছিল—সেটি সংরক্ষণ করা প্রায় অসম্ভব। আর হয়তো সেই অসম্ভবতার মধ্যেই লোরকার সবচেয়ে মানবিক প্রতিকৃতি লুকিয়ে আছে।
তিনি ছিলেন কবি। নাট্যকার। সঙ্গীতপ্রেমী। আন্দালুসিয়ার সন্তান। কিন্তু বুনুয়েল, দালি, নেরুদা, গিয়েন, সালিনাস কিংবা আলেইক্সান্দ্রের স্মৃতিতে তিনি এসব পরিচয়ের আগেও একজন মানুষ—এমন একজন মানুষ, যার উপস্থিতি চলে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ থেকে যায়।
সম্ভবত এটাই কোনো মানুষের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শিল্প: সে যা সৃষ্টি করে, তার চেয়েও বেশি কিছু রেখে যায় তার চারপাশে। লোরকার ক্ষেত্রে সেই অদৃশ্য উত্তরাধিকারই আজও আমাদের কাছে ধরা দেয়—একটি কণ্ঠের মতো, একটি পিয়ানোর অসমাপ্ত সুরের মতো, কিংবা দূরে সরে যাওয়া একটি শিখার আলোর মতো।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









