একশো বছর আগে একটি বইকে ভয় পেয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। বইটির নাম ‘পথের দাবী’। লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বইটিতে ছিল বিপ্লব, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। তাই ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকার বইটি নিষিদ্ধ করে। শরৎচন্দ্র তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গেলেন। চিঠি লিখলেন। তার প্রশ্ন ছিল সহজ—একটি বই যদি মানুষকে পড়তেই না দেওয়া হয়, তাহলে লেখকের লেখার অর্থ কী?
রবীন্দ্রনাথের উত্তর ছিল অন্যরকম। তিনি মনে করতেন, কলম দিয়ে যদি শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো হয়, তবে সেই প্রতিবাদের পরিণতিও লেখককে মেনে নিতে হবে। শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলব, আবার সেই শাসকের কাছেই শাস্তি তুলে নেওয়ার আবেদন করব—এই দ্বন্দ্ব রবীন্দ্রনাথের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
দুই মহীরুহ। দুই ভিন্ন জীবন। দুই ভিন্ন রাজনৈতিক বোধ। একজন জোড়াসাঁকোর অভিজাত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে উঠে আসা রবীন্দ্রনাথ। অন্যজন বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন, দুঃখ, প্রেম ও সামাজিক সংকটের খুব কাছ থেকে উঠে আসা শরৎচন্দ্র। তাদের মতবিরোধ তাই শুধু একটি নিষিদ্ধ বইকে ঘিরে ছিল না। এর কেন্দ্রে ছিল একটি বড় প্রশ্ন—একজন শিল্পীর দায় কোথায়? ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে তার কাজ কি শুধু নিজের শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা, নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়া?
একশো বছর পর সেই প্রশ্নই আবার পর্দায় ফিরিয়ে আনছেন সৃজিত মুখার্জি।
তার নতুন ছবি ‘এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ মুক্তি পাচ্ছে ১৫ অক্টোবর, দুর্গাপূজার আবহে। ছবির কেন্দ্রে শরৎচন্দ্র, ‘পথের দাবী’, ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক পত্রালাপ। ইতিহাস কি সত্যিই অতীত? সৃজিতের ছবিতে অতীত শুধু অতীত হয়ে থাকে না। ১৯২৭-এর সেই বিতর্ক যেন ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ায় আজকের দরজায়।
আজও শিল্পীকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। আজও ক্ষমতার সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক আছে। আজও একজন শিল্পী অন্যায় দেখলে তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য নিজের পরিসরের মানুষের কাছ থেকে সমর্থন আশা করেন। কিন্তু সেই সমর্থন সবসময় আসে না।
সৃজিতের কথায়, ‘নিজের সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে আমরা অনেক সময় সহযোগিতা আশা করি। মনে করি, অন্যায় হলে তারাই পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু সেই সমর্থন সবসময় পাওয়া যায় না।’
সেখানেই একশো বছর আগের শরৎচন্দ্র হঠাৎ খুব সমকালীন হয়ে ওঠেন।
নিষিদ্ধ ‘পথের দাবী’
১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘পথের দাবী’। ব্রিটিশ সরকার অভিযোগ করেছিল, বইটি সরকারের প্রতি মানুষের অবজ্ঞা তৈরি করতে এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ উসকে দিতে পারে। বইটি নিষিদ্ধ রইল বছরের পর বছর। নিষেধাজ্ঞা ওঠে ১৯৩৯ সালে—শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর এক বছর পর। কিন্তু বইটি শুধু একটি উপন্যাস হয়ে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সাহিত্যিক প্রতিবাদের একটি দলিল।
এর কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচী—এক বিপ্লবী, যিনি একের পর এক ছদ্মবেশ নিতে পারেন, সমাজের নানা স্তরে মিশে যেতে পারেন এবং ব্রিটিশ পুলিশের চোখ এড়িয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারেন।
তিনি শুধু চরিত্র নন। তিনি একটি সময়ের অস্থিরতা, ক্ষোভ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

দুই সব্যসাচী, দুই প্রতিরোধ
সৃজিত মুখার্জির একই বছরে পর্দায় আসছে দুই ‘সব্যসাচী’। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এ সব্যসাচী সেন যেন দীর্ঘ ঘুমের পর বদলে যাওয়া পৃথিবীতে ফিরে আসা এক মানুষ। ২৬ বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পরও সে তার বিশ্বাস আঁকড়ে থাকে। অন্যদিকে ‘এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’-এর সব্যসাচী মল্লিক অপেক্ষা করেন না। তিনি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সরাসরি লড়েন। ছদ্মবেশ বদলান, বিপদ এড়িয়ে যান, আবার ফিরে আসেন। শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত তিনি।
একজন অপেক্ষা করে। অন্যজন আঘাত করে। সৃজিতের কাছে দুজনই বাঙালির রাজনৈতিক মননের অংশ। তার ব্যাখ্যায়, সব্যসাচী সেনের বিশ্বাস যখন ক্ষমতার আঘাত সহ্য করতে করতে চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন সেটিই রূপ নেয় সব্যসাচী মল্লিকে। একটি স্লোগান ধীরে ধীরে ফিসফিসে কথায় পরিণত হতে পারে। আবার সেই ফিসফিস একদিন বিস্ফোরিত হয়ে উঠতে পারে প্রচণ্ড চিৎকারে।
শরৎচন্দ্রকে নতুন করে দেখা
শরৎচন্দ্রকে আমরা সাধারণত মনে রাখি তার সামাজিক উপন্যাসের জন্য। তার গল্পের মানুষগুলো আমাদের ঘরের মানুষ। তাদের প্রেম, দুঃখ, বঞ্চনা, সামাজিক লড়াই—সবই খুব চেনা। রবীন্দ্রনাথের মতো তার নামকে ঘিরে প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক পরিচিতি বা অবিরাম জনআলোচনা তৈরি হয়নি। কিন্তু ‘পথের দাবী’ শরৎচন্দ্রের আরেকটি পরিচয় সামনে আনে। তিনি শুধু সমাজের গল্প বলেননি। প্রয়োজনে ক্ষমতার চোখেও চোখ রেখেছেন। তার কলমে প্রেম ছিল, সমাজ ছিল, মানুষের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ছিল। আবার সেই কলমেই ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাষা।
একশো বছর পর সেই শরৎচন্দ্রই আবার ফিরে আসছেন বড় পর্দায়। আর তার পাশে থাকছেন রবীন্দ্রনাথ—সম্মতিতে নয়, বরং এক ঐতিহাসিক মতবিরোধের মধ্য দিয়ে। কারণ কিছু বিতর্ক সময়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না।
সময় পেরিয়ে তারা নতুন প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে। শিল্পী কি শুধু লিখবেন? নাকি অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার লেখার দায়ও গ্রহণ করবেন? ‘এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই নতুন সময়ের সামনে রেখে দেয়।
সূত্র: এনডিটিভি, লেখাটি য্যেভাবে লিখেছেন জয়ন্ত ঘোষাল এবং শ্রেয়া সিনহা


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









