সীমান্তের ওপারে তখনও সকাল পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। পাহাড় আর সমুদ্রের মাঝখানে উত্তর কোরিয়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল। পরে পিয়ংইয়ং জানাল, এটি শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নয়—এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী এর কয়েক ঘণ্টা আগেই জানিয়েছিল, উত্তর কোরিয়া পূর্ব সাগরের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি ৭০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং পরে বলেন, এটি ছিল একটি মধ্যপাল্লার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র।
তার দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটি নিচু উচ্চতায় উড়তে উড়তে নিজের গতিপথ বদলাতে পারে এবং এতে এআই প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, এই প্রযুক্তির কারণে ক্ষেপণাস্ত্রটির আঘাত এড়ানো কঠিন। তবে কীভাবে এআই ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
কিম ইয়ো জংয়ের দাবি, এমন প্রযুক্তি বিশ্বের অন্য কোনো দেশের হাতে অন্তত কয়েক বছরেও পৌঁছাবে না।
কথাগুলো বড়। কিন্তু বড় কথার পাশে প্রশ্নও থাকে।
সিউলের সামরিক বিশ্লেষক হং সুং-পিও মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার দাবিকে এখনই সত্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তার মতে, আধুনিক সামরিক শক্তির দিক থেকে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এখনও বিশ্বের শীর্ষ সামরিক শক্তিগুলোর সমতুল্য নয়।
তবে তিনি স্বীকার করেন, শেষ পর্যায়ে গতিপথ বদলাতে পারে—এমন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন। কিন্তু কঠিন মানেই নিখুঁত নয়।
এআইয়ের নতুন যুদ্ধ
যুদ্ধ এখন আর শুধু কামান, বন্দুক আর মানুষের চোখের ওপর নির্ভর করে না।
ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ দেখিয়েছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হলে সামরিক অভিযানের কার্যকারিতা বাড়তে পারে। লক্ষ্য শনাক্ত করা, উৎক্ষেপণের সিদ্ধান্ত এবং আঘাতের পথ নির্ধারণে এআই ক্রমেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর মিলিটারি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হং বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামরিক প্রযুক্তিতে এআই যুক্ত করছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও তার বাইরে নয়।
উত্তর কোরিয়াও হয়তো সেই পথেই হাঁটছে।
রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির সামরিক সহযোগিতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া সামরিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পাচ্ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।
কতটা প্রযুক্তি সেখানে পৌঁছেছে, তা অবশ্য পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
সীমান্তে মাইন, তার পর ক্ষেপণাস্ত্র
নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ঠিক আগে দুই কোরিয়ার সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ছিল।
গত মাসে অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিএমজেডে একটি বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হন। সিউল ও জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন কমান্ডের তদন্তে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইন থেকেই বিস্ফোরণটি ঘটেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাং শিন-চুলের মতে, সীমান্তকে আরও শক্তভাবে বন্ধ করার কাজের অংশ হিসেবে উত্তর কোরিয়া এসব মাইন পুঁতে রেখেছিল।
২০২৪ সালে কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়াকে তার দেশের ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করার পর সীমান্তে মাইন পোঁতা এবং ট্যাংকবিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির কাজ বাড়িয়েছে উত্তর কোরিয়া।
কিন্তু বিস্ফোরণের দায় পিয়ংইয়ং স্বীকার করেনি।
সংলাপের হাত বাড়িয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের জবাব
এই উত্তেজনার মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং উত্তর কোরিয়াকে আবার আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান।
তার সরকার উত্তরের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে চাইছিল।
কিন্তু সামরিক বাহিনী একই সময়ে উত্তর কোরিয়ার কাছে বিস্ফোরণের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলে।
কিম ইয়ো জং সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘জঘন্য’ বলে আক্রমণ করেন এবং লির সংলাপের প্রস্তাবকে উপহাস করেন।
তার ভাষায়, ক্ষমা চাওয়ার দাবি ছিল হাস্যকর।
এরপর তিনি সতর্ক করে বলেন, মাইন বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ কোরিয়া যা-ই করুক, পিয়ংইয়ং তার জন্য প্রস্তুত।
পরদিনই আকাশে উঠল সেই ক্ষেপণাস্ত্র।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বার্তাটি তাই শুধু একটি সামরিক পরীক্ষার নয়।
সিউল বলেছিল—চলুন কথা বলি।
পিয়ংইয়ং বলল—আমরা প্রস্তুত।
আর তারপর আকাশের দিকে উঠে গেল একটি ক্ষেপণাস্ত্র।
সিউলের সাবেক নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ইয়াং মু-জিনের ভাষায়, দক্ষিণ কোরিয়া উত্তেজনা কমাতে চেয়েছিল, কিন্তু উত্তর কোরিয়া তার জবাব দিয়েছে উত্তেজনা বাড়িয়ে।
অর্থাৎ, সদিচ্ছার জবাবে আপাতত সংলাপ নয়—সংঘাতের পথই বেছে নিচ্ছে উত্তর কোরিয়া।
সীমান্তের মাটিতে মাইন রয়ে গেছে। আকাশে রয়ে গেছে ক্ষেপণাস্ত্রের পথ। আর দুই দেশের মাঝখানে, আগের মতোই, পড়ে আছে কথোপকথনের একটি অসম্পূর্ণ দরজা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









