একটি শিশুর পৃথিবী খুব ছোট। একটি ঘর, একটি উঠান, স্কুলে যাওয়ার পথ, বিকেলের খেলা, মায়ের ডাক, বাবার হাত, পরিচিত কয়েকটি মুখ। সেই ছোট পৃথিবীতেই সে নিরাপত্তা খুঁজে নেয়। কার কাছে গেলে আদর পাওয়া যায়, কার হাত ধরে রাস্তা পার হতে হয়, কার কথা শুনতে হয়—ধীরে ধীরে সে এসব শিখে ফেলে।
শিশু পৃথিবীকে প্রথমে সন্দেহ করে না। বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসই তার শৈশবের প্রথম আশ্রয়। তাই কোনো শিশু যখন যৌন সহিংসতার শিকার হয়, তখন শুধু তার শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। ভেঙে যায় তার পৃথিবীর একটি মৌলিক ধারণা—পরিচিত মানেই নিরাপদ, বড় মানেই রক্ষাকারী, ঘর মানেই আশ্রয়। যে মানুষটির মুখ দেখে সে এতদিন নিশ্চিন্ত হয়েছে, সেই মুখেই যদি ভয় এসে বসে, তখন শিশুর কাছে পৃথিবী আর আগের মতো থাকে না। একটি দরজা তখন শুধু দরজা নয়। একটি ঘর শুধু ঘর নয়। একটি পরিচিত হাতও আর শুধু হাত নয়।
ধর্ষণকে আমরা প্রায়ই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখি। একজন অপরাধী, একজন ভুক্তভোগী, একটি জায়গা, একটি সময়। তারপর মামলা হবে, তদন্ত হবে, আদালত হবে, শাস্তি হবে। এই প্রক্রিয়া অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু ধর্ষণের গল্প সেখানে শুরু হয় না। গল্পটি অনেক আগে শুরু হয়। শুরু হয় আমাদের ধারণায়—পুরুষ কেমন হবে, নারী কেমন হবে, শিশুর সঙ্গে বড় মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে, কার কথা বিশ্বাসযোগ্য, কার কথা সন্দেহজনক, কার শরীরের ওপর কার অধিকার, ‘না’ কথাটির অর্থ কতটা দৃঢ়।
একটি সমাজ যখন ছেলেকে শেখায় শক্ত হওয়া মানে কর্তৃত্ব করা, প্রত্যাখ্যান মানে অপমান, জেদ মানে পৌরুষ—তখন তার ভেতরে ক্ষমতার একটি ভাষা তৈরি হতে থাকে। আর যখন মেয়েকে শেখানো হয়, বিপদ এড়ানো তার নিজের দায়িত্ব—কোথায় যাবে, কী পরবে, কার সঙ্গে থাকবে, কখন বাড়ি ফিরবে—তখন অপরাধীর দায়িত্বটি ধীরে ধীরে দৃশ্যের বাইরে চলে যায়।
একজন নারী কেন সেখানে ছিলেন—এই প্রশ্নটি সহজ হয়ে ওঠে। কিন্তু একজন পুরুষ কেন তার ‘না’কে অগ্রাহ্য করলেন—এই প্রশ্নটি যেন কঠিন। এই প্রশ্নের অসাম্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যৌন সহিংসতা শুধু আকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যের ইচ্ছাকে অস্বীকার করার প্রবণতা। একটি শরীরকে তার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা মানে সেই শরীরের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা।
শিশুর ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার অসমতা আরও গভীর। একটি শিশু জানে না কীভাবে ক্ষমতা কাজ করে। সে জানে না সামাজিক মর্যাদা কী। সে জানে না একজন বড় মানুষকে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়। তাকে বরং শেখানো হয়—বড়দের কথা শুনতে হবে, শিক্ষককে সম্মান করতে হবে, আত্মীয়কে মানতে হবে, বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়া যাবে না।
এই শিক্ষা প্রয়োজনীয়। কিন্তু তার পাশে আরেকটি শিক্ষা না থাকলে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। শিশুকে শেখাতে হয়—বড় মানুষও ভুল করতে পারে। পরিচিত মানুষও সীমা লঙ্ঘন করতে পারে। কেউ তাকে এমনভাবে স্পর্শ করলে, যাতে তার অস্বস্তি হয়, সে ‘না’ বলতে পারে। কেউ তাকে ভয় দেখালে সে তা বলতে পারে। এমনকি সেই মানুষটি যদি পরিচিত হয়, প্রিয় হয়, পরিবারের হয়, শিক্ষক হয়—তবু বলতে পারে। শিশুর জন্য এই শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি নিরাপত্তার ভাষা।
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের যে পরিসংখ্যান সামনে আসে, তা এই ভাষাহীনতার ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত অন্তত ৩০৬ জন মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৯ জনের বয়স ছয় বছরের নিচে, ৯৪ জনের বয়স সাত থেকে বারো বছর এবং ১০৩ জন ছিল কিশোরী। একই সময়ে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে আরও ১২৯টি ক্ষেত্রে।
২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত অন্তত ১১৮ শিশুর ধর্ষণের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে ৪৬টি ক্ষেত্রে। ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টার পর অন্তত ১৭ শিশু নিহত হয়েছে।
সংখ্যাগুলো আমাদের থামিয়ে দেয়। কিন্তু সংখ্যা একটি শিশুর কান্নার শব্দ শোনাতে পারে না। একটি সংখ্যার কোনো মুখ নেই। কোনো প্রিয় খেলনা নেই। কোনো স্কুলব্যাগ নেই। কোনো মায়ের কোলে মুখ লুকানোর স্মৃতি নেই। তাই প্রতিটি সংখ্যার পেছনে যে একটি মানুষ আছে, সেই কথাটি মনে রাখা জরুরি। আর এই সংখ্যাগুলোও সম্পূর্ণ নয়। অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। শিশু বলতে পারে না। পরিবার বলতে চায় না। কেউ ভয় পায়। কেউ লজ্জা পায়। কেউ ভাবে, কথা ছড়িয়ে পড়লে শিশুটির ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে। কখনো অপরাধী পরিবারেরই কেউ। কখনো সে এমন একজন, যার সামাজিক পরিচয় এত শক্তিশালী যে তাকে অভিযুক্ত করাই পরিবারের কাছে অসম্ভব মনে হয়। তখন নীরবতা তৈরি হয়। নীরবতা কখনো নিছক চুপ করে থাকা নয়। নীরবতা তৈরি করারও পদ্ধতি আছে।
“কাউকে বলবে না।” “এটা আমাদের পরিবারের ব্যাপার।” “চুপ থাকো।” “কেউ বিশ্বাস করবে না।” “মানুষ কী বলবে?”
একটি শিশুকে চুপ করিয়ে দিতে সবসময় কঠিন কোনো হুমকি দরকার হয় না। কখনো শুধু তার চারপাশের বড় মানুষদের ভয়ই যথেষ্ট। শিশুটি তখন একটি অসম্ভব সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়ায়—সে কি সত্য বলবে, নাকি সেই মানুষদের রক্ষা করবে যাদের সে ভালোবাসে? এখানে সবচেয়ে নির্মম ব্যাপার হলো, শিশুটি অপরাধের পরেও একা থাকে না; তার সঙ্গে থাকে অপরাধীর ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা কখনো ভয় হয়ে আসে। কখনো পরিচয় হয়ে আসে। কখনো পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে আসে। কখনো সামাজিক সম্মান হয়ে আসে।

আর তখন প্রশ্নগুলোও বদলে যায়। “কেন সেখানে গিয়েছিলে?” “আগে বলোনি কেন?” “তুমি চিৎকার করোনি কেন?” “আবার তার কাছে গেলে কেন?” প্রশ্নগুলো শুনতে নিরীহ। কিন্তু এগুলোর ভেতরে একটি বিপজ্জনক পরিবর্তন ঘটে। অপরাধীর কাজের বদলে শিশুর আচরণ তদন্তের বিষয় হয়ে ওঠে।
শিশুটি কেন সেখানে ছিল? এর চেয়ে জরুরি প্রশ্ন—প্রাপ্তবয়স্ক মানুষটি কেন তার বিশ্বাসের সুযোগ নিল? শিশুটি কেন চুপ ছিল? এর চেয়ে জরুরি প্রশ্ন—কী তাকে চুপ করে থাকতে বাধ্য করেছিল? শিশুটি কেন আগে বলেনি? এর চেয়ে জরুরি প্রশ্ন—সে বললে আমরা কি তাকে বিশ্বাস করতাম? এই প্রশ্নগুলো সমাজের আয়না।
কারণ কোনো শিশু সাধারণত এমন পৃথিবী চেনে না, যেখানে তাকে নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রাপ্তবয়স্কের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। সে জানে বড়রা তাকে রক্ষা করবে। তাই যে বড় মানুষটি তার নিরাপত্তার জায়গাটিকেই আক্রমণ করে, সে শুধু একটি সীমা ভাঙে না; শিশুর বিশ্বাসের কাঠামোটিও ভেঙে দেয়।
এই কারণেই পরিচিত মানুষকে ঘিরে যৌন সহিংসতা বোঝা জরুরি। ধর্ষণের প্রচলিত ছবিতে একজন অচেনা পুরুষ থাকে, নির্জন রাস্তা থাকে, অস্ত্র থাকে, শারীরিক প্রতিরোধ থাকে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। অপরাধী পরিচিত হতে পারে। এমনকি খুব পরিচিত। পরিবারের কেউ, প্রতিবেশী, শিক্ষক, বন্ধুবান্ধবের কেউ, কোনো দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক। অপরাধীর মুখ যত পরিচিত, সত্যটি মেনে নেওয়া কখনো কখনো তত কঠিন।
“ও তো এমন মানুষ নয়।” “ও তো আমাদেরই লোক।” “ওকে সবাই চেনে।” “এতদিনে তো কখনো কিছু হয়নি।” এই বাক্যগুলো একটি শিশুর অভিজ্ঞতাকে বাতিল করে দিতে পারে। কিন্তু একটি শিশুর শরীর কোনো সামাজিক পরিচয়ের কাছে ঋণী নয়। কেউ ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত হলেই তার হাতে শিশুর শরীরের ওপর অধিকার জন্মায় না।
কেউ শিক্ষক হলেই নয়। কেউ আত্মীয় হলেই নয়। কেউ অভিভাবকসুলভ হলেই নয়। শিশুর শরীর তার নিজের। এই সরল সত্যটি আমাদের সামাজিক শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া দরকার। আর শিশুর শরীরের সঙ্গে তার মনের সম্পর্কটিও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। যৌন নির্যাতন ঘটনার মুহূর্তে শেষ হয়ে যায় না। শরীরের ক্ষত শুকিয়ে যেতে পারে, কিন্তু ভয় সবসময় শুকায় না। কখনো তা স্মৃতিতে থেকে যায়। কখনো নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণায়। কখনো সম্পর্কের মধ্যে। কখনো অন্য মানুষকে বিশ্বাস করার ক্ষমতায়।
একটি শিশু বড় হয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করতে পারে— আমার কি দোষ ছিল? আমি কি কিছু ভুল করেছিলাম? আমি কি কাউকে থামাতে পারতাম? এই আত্মদোষবোধের জায়গাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অপরাধীর দায় যদি সমাজ ভুক্তভোগীর ওপরও ভাগ করে দেয়, তবে শিশুটি শুধু সহিংসতার শিকার হয় না; সে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও শেখে।
তাই তাকে বারবার বলতে হয়—দোষ তোমার নয়। তোমার পোশাকের নয়। তোমার চুপ থাকার নয়। তোমার বিশ্বাস করার নয়। তুমি পালাতে পারোনি বলে নয়। তুমি আগে বলতে পারোনি বলে নয়। দায় তার, যে তোমার সীমা অতিক্রম করেছে।এই কথাগুলো শুধু সান্ত্বনা নয়। এগুলো ন্যায়বোধের পুনর্গঠন। শিশুর জন্য আরোগ্য তাই শুধু আদালত বা চিকিৎসা নয়। তাকে এমন একটি পরিবেশ দিতে হয়, যেখানে সে নিজের অভিজ্ঞতাকে ভাষা দিতে পারে, নিজের শরীরকে আবার নিজের বলে অনুভব করতে পারে এবং বুঝতে পারে—তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি তার পরিচয় নয়।
বিচারও তাই শুধু শাস্তি নয়। বিচার মানে শিশুর কথা শোনা। তার পরিচয় গোপন রাখা। তদন্তের সময় তাকে বারবার একই আঘাতের কথা বলতে বাধ্য না করা। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া। মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করা। তার পরিবারকে পাশে দাঁড় করানো। এবং সবচেয়ে জরুরি—তাকে বিশ্বাস করা।
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুরু হয়। কিন্তু রাষ্ট্র শুধু পুলিশ, আদালত বা আইন নয়। রাষ্ট্র হলো সেই স্কুল, যেখানে শিশুটি প্রতিদিন যায়। সেই হাসপাতাল, যেখানে সে চিকিৎসা নিতে পারে। সেই প্রতিষ্ঠান, যেখানে অভিযোগ জানানো যায়। সেই ব্যবস্থাও, যা নির্ধারণ করে একটি শিশুর কথা কতটা গুরুত্ব পাবে।
একটি শিশু যখন থানায় যায়, আদালতে যায়, চিকিৎসকের সামনে বসে কিংবা কোনো সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে, তখন সে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেখা করছে না। সে রাষ্ট্রের সঙ্গে দেখা করছে। সেই সাক্ষাৎ যদি তাকে আরও ভয় পাইয়ে দেয়, তবে রাষ্ট্র তার কাছে আরেকটি অচেনা ক্ষমতা হয়ে ওঠে। আর যদি সে অনুভব করে—কেউ শুনছে, কেউ বিশ্বাস করছে, কেউ তাকে রক্ষা করতে চায়—তবে রাষ্ট্র প্রথমবার তার কাছে নিরাপত্তার অর্থ বহন করতে পারে।
কিন্তু রাষ্ট্রের বাইরেও একটি বিশাল ক্ষেত্র আছে—আমাদের ঘর। ধর্ষণের মানসিকতা আইনবইয়ের বাইরে তৈরি হয়। তৈরি হয় কথায়, ঠাট্টায়, আচরণে, পারিবারিক শিক্ষায়। একটি ছেলে যখন কোনো মেয়েকে বিরক্ত করে এবং বন্ধুরা হেসে ওঠে।একটি মেয়ের প্রতিবাদ যখন ‘বাড়াবাড়ি’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। একজন পুরুষের আগ্রাসন যখন ‘পুরুষ তো এমনই’ বলে স্বাভাবিক করা হয়। একটি শিশুর অভিযোগ যখন ‘বড়দের ব্যাপার’ বলে থামিয়ে দেওয়া হয়। একজন পরিচিত মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে যখন প্রথম কাজ হয় তাকে রক্ষা করা। এসব আলাদা আলাদা ঘটনা। কিন্তু এগুলো মিলে একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে। সেই সংস্কৃতি বদলাতে হলে ছেলেদেরও নতুন ভাষা শেখাতে হবে।
শক্তি মানে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার নয়। আকাঙ্ক্ষা মানে অধিকার নয়। প্রত্যাখ্যান অপমান নয়। ভালোবাসা মালিকানা নয়। আর ‘না’ মানে ‘না’। শিশুর ক্ষেত্রে এই শিক্ষা আরও স্পষ্ট— তার শরীরের ওপর কোনো প্রাপ্তবয়স্কের যৌন অধিকার নেই।
শুধু মেয়েদের সাবধান হতে বলা যথেষ্ট নয়। ছেলেদেরও শেখাতে হবে সীমা। পরিবারকে শেখাতে হবে শিশুর কথা শুনতে। শিক্ষককে শেখাতে হবে ক্ষমতার সীমা। প্রতিষ্ঠানকে শেখাতে হবে জবাবদিহি। সমাজকে শেখাতে হবে—সম্মান মানে সত্য গোপন করা নয়। কারণ কোনো পরিবারের সম্মান একটি শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম একটি শিশুর কণ্ঠস্বরের চেয়ে বড় হতে পারে না। কোনো পরিচিত মানুষের সামাজিক মর্যাদা একটি শিশুর শরীরের চেয়ে বড় হতে পারে না।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই ভবিষ্যৎ। কিন্তু শিশুকে শুধু ভবিষ্যৎ বলে দেখলে তার বর্তমানটি অদৃশ্য হয়ে যায়। সে এখনই একজন মানুষ। এখনই তার ভয় আছে। এখনই তার মর্যাদা আছে। এখনই তার শরীরের ওপর তার অধিকার আছে। তাই তাকে রক্ষা করার কাজ ভবিষ্যতের জন্য নয়। এখনকার জন্য।
ধর্ষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গভীর পরিবর্তন শুরু হতে পারে একটি ছোট জায়গা থেকে—একটি শিশু যখন কথা বলে, তখন আমরা কী করি। আমরা কি তাকে থামাই? নাকি শুনি? আমরা কি তাকে সন্দেহ করি? নাকি নিরাপদ করি? আমরা কি জিজ্ঞেস করি, “তুমি সেখানে গেলে কেন?” নাকি জিজ্ঞেস করি, “তোমার সঙ্গে কী হয়েছিল?”
এই পার্থক্য সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু একটি শিশুর জীবনে এটি বিশাল। কারণ শিশুর পৃথিবী ছোট। তার চারপাশের বড় মানুষগুলোই সেই পৃথিবীর দেয়াল, দরজা ও জানালা। দেয়াল যদি তাকে আটকে রাখে, দরজা যদি বন্ধ হয়ে যায়, জানালা যদি বাইরে যাওয়ার পথ না দেখায়—তাহলে তার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়।
আর যদি দরজা খোলা থাকে? যদি সে জানে, কথা বললে কেউ শুনবে? যদি সে জানে, ভয় পেলে কারও কাছে যেতে পারবে? যদি সে জানে, তার শরীর তার নিজের? তাহলে সেই ছোট পৃথিবীটিই আবার নিরাপদ হতে শুরু করে। একটি শিশুর শরীর ছোট। কিন্তু তার অধিকার ছোট নয়। তার কণ্ঠস্বর হয়তো কাঁপবে। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরের মূল্য কম নয়।
কোনো সমাজ কতটা সভ্য, তা শুধু তার আইনে লেখা থাকে না। কখনো তা প্রকাশ পায় একটি শিশুর মুখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বড় মানুষটির আচরণে। সে কি শিশুটির দিকে ঝুঁকে এসে বলে—‘আমি তোমার কথা শুনছি।’
নাকি মুখ ফিরিয়ে বলে—‘চুপ করো, এসব কথা বলা যাবে না।’
এই দুই বাক্যের মাঝখানেই একটি সমাজের চরিত্র লুকিয়ে থাকে। আর শিশুর জন্য, কখনো কখনো, এই দুই বাক্যের মাঝখানেই তার ভবিষ্যৎ মানুসিক গঠনের পথ তৈরি করে। যত্নটা সেখানেই নেওয়া তাই অবশ্যই করণীয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









