এক বনে ছিল ছোট্ট এক কুনোব্যাঙের ছানা, নাম তার টুগু। টুগু দেখতে যেমন গোলগাল আদুরে, তেমনি তার স্বভাব ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারাদিন সে টুপটাপ করে এখানে-সেখানে লাফিয়ে বেড়াত।
কিন্তু তার একটা মস্ত বড় দোষ ছিল—সে কারো কথা শুনত না। বড়দের দেওয়া কোনো নিয়মকানুন বা শিক্ষা একদম পাত্তা দিত না। সে মনে মনে ভাবত, “আমি তো এত সুন্দর লাফাতে পারি, পোকা ধরতে পারি, আমার আবার নতুন করে শিক্ষার কী দরকার?”
বর্ষাকাল শুরু হতেই বনের চারপাশ পানিতে থৈ থৈ করতে লাগল। টুগুর বাবা-মা তাকে ডেকে বললেন, ‘টুগু, বর্ষার সময় বনের বড় দিঘিটায় কিন্তু একদম যাবে না। ওখানে একটা মস্ত বড় বোয়াল মাছ আর একটা ধূর্ত বক ওত পেতে থাকে। বড়দের কাছ থেকে আগে শেখো, কীভাবে বিপদে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।’
টুগু তার স্বভাবসুলভ কায়দায় ঠোঁট উল্টে বলল, ‘ধুর! আমি সব জানি। আমার চেয়ে ভালো কে লাফাতে পারে? আমার কোনো শিক্ষার দরকার নেই।’ এই বলে সে নিজের খেয়ালে গান গাইতে গাইতে দিঘির দিকে রওনা দিল।
দিঘির পাড়ে এসে টুগু মনের সুখে লাফালাফি শুরু করল। ঠিক তখনই পাশের একটা কচুরিপানার আড়ালে বসে থাকা এক মস্ত বুড়ো কচ্ছপ তাকে দেখে বলল, ‘খোকন ব্যাঙ, এভাবে খোলা জায়গায় থেকো না। আকাশের দিকে তাকিয়েছ? ওই দেখো, বকপাখি উড়ছে। বিপদ চেনার শিক্ষাটা অন্তত নাও! টুগু কচ্ছপ দাদুর কথা হেসেই উড়িয়ে দিল। সে বলল, ‘আরে দাদু, বক তো সাদা ধবধবে, দেখতে কত সুন্দর! ও কেন আমার ক্ষতি করবে? তোমরা বড্ড বেশি ভয় পাও।’
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে দেখতে পেল দিঘির জলে একটা লালচে জিনিস ভাসছে। কৌতূহলবশত টুগু একটু এগিয়ে গেল। আসলে সেটা ছিল বকের ছায়া। বকটি ধীরে ধীরে পানির ধারে এসে দাঁড়াল।
টুগু বুঝতেই পারল না কী হতে যাচ্ছে। সে আগের মতোই লাফাতে লাগল। হঠাৎ বকটি তার ঠোঁট দিয়ে টুগুকে ধরে ফেলতে চাইল। টুগু ভয় পেয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে পড়ল বাবা-মায়ের কথা।
সে প্রাণপণে লাফ দিয়ে বকের ঠোঁট থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। কোনোমতে পাশের ঝোপের মধ্যে গিয়ে লুকাল। তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হলো না। টুগু যখন ভাবছিল সে বেঁচে গেছে, তখনই পানির নিচ থেকে একটা মস্ত বড় ছায়া ভেসে উঠল। বোয়াল মাছটি টুগুকে দেখে মুখ বড় করে এগিয়ে এল। টুগু এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, বড়দের কথা না শোনার ফল কত ভয়ংকর হতে পারে।
সে দ্রুত সাঁতার কেটে তীরের দিকে যেতে লাগল। কিন্তু বোয়াল মাছও তার পিছু নিল। অনেক কষ্টে টুগু একটা পাথরের আড়ালে গিয়ে লুকাল। সেখানে বসে সে ভাবতে লাগল, যদি আমি বাবা-মায়ের কথা শুনতাম, তাহলে আজ এত বিপদে পড়তে হতো না। নিজের জ্ঞান নিয়ে এত অহংকার করা ঠিক হয়নি।
এরপর থেকে টুগু আর কখনো বড়দের কথা অমান্য করত না। সে বুঝেছিল, অভিজ্ঞদের শিক্ষা জীবনে অনেক বিপদ থেকে রক্ষা করে। টুগু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভাবল, “বড়দের কথা না শুনে আমি আজ নিজের জীবনটাই বিপদের মুখে ফেলেছিলাম। সত্যিই তাদের কথা মেনে চলা উচিত ছিল।”
সে ধীরে ধীরে নিরাপদ জায়গায় ফিরে এল। বাবা-মাকে দেখে তার চোখে পানি চলে এল। টুগু বলল, `বাবা, মা, আমি ভুল করেছি। তোমাদের কথা না শুনে বড় ভুল করেছি। আজ থেকে আমি সবসময় তোমাদের কথা শুনব।'
বাবা-মা টুগুকে আদর করে বললেন, ‘ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াই সবচেয়ে বড় কথা। যে নিজের ভুল বুঝতে পারে, সে-ই জীবনে এগিয়ে যেতে পারে।’ এরপর থেকে টুগু আর কখনো বড়দের কথা অমান্য করত না। সে বুঝে গেল, অভিজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চললে অনেক বিপদ থেকে বাঁচা যায়।
সেই থেকে টুগু বনের সবচেয়ে লক্ষ্মী আর বুদ্ধিমান ব্যাঙ হিসেবে পরিচিত হলো। এখন আর সে অহংকার করে না, বরং অন্য ছোট ব্যাঙদেরও শেখায়— ‘বড়দের কথা শুনবে, বিপদকে চিনবে এবং কখনো নিজের জ্ঞান নিয়ে অহংকার করবে না।’ বরং বড়দের উপদেশ মেনে চললে বিপদ এড়ানো যায়। অহংকার পতনের মূল।
লেখক : জালাল জাবির


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









