২০২৬ ইংরেজি, ১৪৩৩ বাংলা ও ১৪৪৮ হিজরি চলমান। বাংলা মাস আষাঢ়, ঋতু বর্ষাকাল। বর্ষা মানেই বৃষ্টি, নদীর পানি ও বন্যা। লাগাতার বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
চারদিকে শুধু থৈ থৈ পানি, অনেক শহর ও জনপদ জনশূন্য হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, সাতকানিয়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, খুলনাসহ দেশের বহু জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও দেখে মনে হচ্ছে, এবারের বন্যা অতীতের অনেক বন্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। লক্ষাধিক গবাদিপশু, অসংখ্য ঘরবাড়ি ও বহু মানুষের জীবন ও স্মৃতি এই বন্যায় হারিয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও রাষ্ট্রপ্রধান উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বাংলাদেশ সরকার ও প্রশাসন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে কাজ করছে। পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে এবং বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে অনেকেই বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে এই সময়ে কিছু বিষয় আমাকে ভাবায়।
প্রথমত, যারা সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করছেন, তাদেরও কেউ কেউ সমালোচনা বা অপমান করছেন। কেউ কম সহযোগিতা করলে তাকে ব্যঙ্গ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। দ্বিতীয়ত, কিছু মিডিয়াকর্মীকে ভাইরাল হওয়ার উদ্দেশ্যে নাটকীয় ভিডিও তৈরিতে ব্যস্ত দেখা যায়, অথচ পাশে থাকা বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করার সুযোগ তারা হারিয়ে ফেলেন। তৃতীয়ত, অনেকে দানের চেয়ে প্রচারণাকে বেশি গুরুত্ব দেন। অথচ আসল বিষয় হলো আন্তরিক সহযোগিতা, প্রচার নয়। চতুর্থত, অনেকেই মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছেন। সংকটের সময় সত্য তথ্য প্রচার করাই সবার দায়িত্ব।
এই প্রসঙ্গে চার বছর আগের, অর্থাৎ ২০২২ সালের বন্যার একটি স্মৃতি আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তখন সিলেট ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত। আমি ছিলাম ময়মনসিংহ বিভাগের নান্দাইলে। দূরে থেকেও নিজের জন্মভূমির মানুষের কষ্ট সহ্য করতে পারছিলাম না। তাই কয়েকজন মিলে বন্যার্তদের জন্য সহায়তা নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় ফরমালিনমুক্ত কাঁঠাল ও মুড়ি সংগ্রহ করি। অবশেষে ১২ জনের একটি দল সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হই।
আঠারোবাড়ি থেকে একটি বড় নৌকা ভাড়া করে যাত্রা শুরু করি। আমাদের সঙ্গে দুটি ছোট্ট শিশু—সাবিহা ও সামিহাও ছিল। প্রথমে অনেকেই তাদের নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাও আমাদের সঙ্গে যায়। মোবাইল ম্যাপ দেখে নৌকায় করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আমরা কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ হয়ে সিলেটের দিকে এগিয়ে যাই। পথে বড় বড় ঢেউ, টানা বৃষ্টি ও ডুবে যাওয়া সেতুর কারণে নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়।
কুশিয়ারা নদীর তীরে নৌকা ভিড়তেই স্থানীয় মানুষ আমাদের ঘিরে ধরেন। আমরা কাঁঠাল ও মুড়ি বিতরণ শুরু করি। ছোট্ট সাবিহা ও সামিহাও আনন্দের সঙ্গে ত্রাণ বিতরণে অংশ নেয়। মানুষের আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, আমাদের নিয়ে যাওয়া সামান্য উপহারও তাদের কাছে অনেক মূল্যবান। তারা আমাদের আন্তরিকভাবে আপ্যায়নও করেন, যা আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে।
পরে আমরা ফেঞ্চুগঞ্জ হয়ে মির্জানগর ও ইনাত আলীপুরের বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাই। মির্জানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে আমার শৈশবের পড়াশোনা, সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের দুর্ভোগ দেখে মন ভারী হয়ে যায়। আমরা প্রতিটি পরিবারে একটি করে কাঁঠাল ও মুড়ি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি। এরপর ইনাত আলীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ত্রাণ বিতরণ করি। এত কিছুর পরও কিছু কাঁঠাল অবশিষ্ট ছিল, যা পরে মায়ের কাছে রেখে আসি। পরে জানতে পারি, আরও অনেকে শুধু সেই ফরমালিনমুক্ত কাঁঠাল নেওয়ার জন্য আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন।
আজও সেই স্মৃতি আমাকে মনে করিয়ে দেয়—যদি আমরা প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী পরিকল্পনা করে এগিয়ে আসি, তাহলে দুর্যোগের সময় অসংখ্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
লেখক : এম আলী হুসাইন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









