রাজ্যে হৈ হৈ সাজ সাজ রব,আনন্দের সীমা নাই। রাজা রানীর একটাই কথা রাজ্যে সবখানে খুশির বার্তা ছড়িয়ে দাও ওদের একমাত্র কন্যা হীরেমতির শুভ বিয়ে। রাজকন্যা হীরেমতি পানি পান করতে গলা দেখা যায় এতো রুপসী দেখতে,এতো সুন্দরী। এই রাজ্যে এমন সুন্দরী আর নাই। রাজকন্যা বলে কথা।
পাড়া পড়শি মহা খুশি এবার ভালোমন্দ খাবেন বেশ ক’দিন সবাই রাজার মেয়ের বিয়ে। চাল, ডাল, মাছ, মাংস,আলু, রান্নার যাবতীয় উপকরণ বস্তায় বস্তায় নিয়ে আসছে সওদা করে একের পর এক সৈন্য সামন্তরা। কোর্মা পোলাও বিরিয়ানি রান্নার মহা-আয়োজন রাজ দরবারের খোলা মাঠে। বাঘা বাঘা বাবুর্চি তাদের কাজকাম শুরু করে দিয়েছে- চুল্লী বানানো,বড় বড় হান্ডি,ডেক্সি,কড়াই,থালা-বাসন ধোয়া আরো কত কী।
এদিকে অনেকের গানের তালে নাচের আয়োজন,ছোট বড় কেউ কেউ আবার সং সাজার কাজে ব্যস্ত। বিয়ের বিশাল স্টেজ বানানো হচ্ছে। রঙে রঙে রঙিন বাতিতে আলোয় আলোয় স্বজ্জিত পুরো এলাকা। সখা-সখি নতুন কাপড় আলতা,নক পালিশ,রঙিন চুড়ি,টিপ,চুলে ফুল,হাতে মেহেদি নিয়ে মশগুল। পুরো রাজ্য জুড়ে মহা-আনন্দ খুশির আমেজ যেন উপচে পড়ে।
এতদিন রাজকন্যার জন্য উপযুক্ত বর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। তাই বলে রাজা রানীর খুব মন খারাপ। খুব চিন্তিত। কি করবে রাজ কন্যাকে নিয়ে।
এক মাত্র রাজকন্যার উপযুক্ত বর সে-ই হবে এক দিন এই রাজ্যের অধিপতি,তাকে রাজ্য শাসন করতে হবে,রাজসভা চালাতে হবে,আচার-বিচার করতে হবে। তাই এমন একজন সুদর্শন বর দরকার যে ভাবে হোক রাজ কন্যার জন্য চা-ই চাই। রাজা নির্দেশ দিলেন রাজ্যে সব গণকদের জানিয়ে দাও- আমার এক মাত্র সুন্দরী রাজকন্যার জন্য উপযুক্ত বর দরকার। যে বর খুঁজে দিতে পারবে সে উপহার হিসেবে পাবে-মনিমুক্তা খঁচিত রাজ্যের সবচেয়ে দামী রাজমোহর। রাজার কথায় এলাকার গণকরা খেয়ে না খেয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্ত রাজকন্যার উপযুক্ত বর না পেয়ে সবাই হতাশ। রাজাকে সাহসও পাচ্ছেন না বলতে, এখন উপায়? একান ওকান করে করে অবশেষে রাজার কানে গেল উপযুক্ত বর পায়নি রাজকন্যার জন্য। রাজা সব ঘটকদের রাজদরবারে ডেকে পাঠালেন। ব্রাহ্মণদের কথা মতো অমাবশ্যা পূর্ণিমা তিথি দেখে গণক ডেকে কত কিছুর আয়োজন দিনের পর দিন,মাসের পর মাস। সব বৃথা।
রাজমহাশয় চটে গেলেন ফলে-ভাগ্য গণকদের রাজ্য থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। উপায়ন্তর না দেখে এবার একে একে ঘটকদের রাজদরবারে ডেকে পাঠালেন রাজামহাশয়। উপস্থিত ঘটকদের একটাই কথা আমার এক মাত্র সুন্দরী রাজকন্যা তার বিয়ের পাত্র খুঁজে আনতেই হবে তোমাদের। অন্যতায় এই রাজ্যে কেউ থাকতে পারবে না আমি আজ সাফ কথা জানিয়ে দিলাম। এই কথা মনে থাকে যেন। আমার মেয়ের বর এমন হওয়া চাই এই রাজ্যে অদ্বিতীয়। তাকে একদিন এই রাজ্য শাসন করতে হবে। সে একদিন হবে এই রাজ্যের প্রধান। তোমাদের যা খুশি লাগে টাকা কড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ো। তবে মনে রেখো-এই পূর্ণিমা তিথিতেই শুভ বিয়ের লগ্ন দিতে চাই আমি। ঘটকরা সমস্বরে জোড় গলায় জ্বী হুজুর! জ্বী হুজুর! বলে চলে গেল। যেতে যেতে পথে ঘটকরা ভাবলো গণকের মতো হলে আমাদের আর রক্ষা নাই। রাজ কন্যার বর যে ভাবে হোক খুঁজে বের করতেই হবে ভাই-করতেই হবে।
বেশ কিছুদিন সময় পার হলো কোন ঘটক রাজকন্যার উপযুক্ত হবু বর খুঁজে পেল না। কী মহা মুশকিল। এদিকে পূর্ণিমার দিন ক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। রাজমহাশয় যদি ক্ষেপে যায় তাহলে গণকের মতো দেশ ছাড়তে হবে। এখন উপায়। তাদের নাওয়া খাওয়া উঠে গেছে চিন্তায় চিন্তায়।
স্রষ্টার কী মহিমা একদিন হঠাৎ সাত সকালে রাজদরবারে চাচ্চু ঘটক হাজির শুভ সংবাদ নিয়ে। কিন্তু বিপত্তি এখানে রাজদরবারের গেইটে প্রহরীরা আটকিয়ে দিলো তাকে। প্রহরীদের কড়া নির্দেশ রাজামহাশয় ঘুমে আছন্ন তাকে এমন সময় ঘুম ভাঙানোর সাধ্য কারো নাই। ঘটক অনুনয় বিনয় করে আবার বলল- ভাই আমি রাজ কন্যার হবু বরের খোঁজ নিয়ে এসেছি মহারাজের কাছে। আজ তাকে এই খবর জানাতে না পারলে আমাকে আমার পরিবার নিয়ে এই রাজ্য ছাড়তে হবে। দয়া করে আমাকে মহারাজার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন। সাত পাঁচ ভেবে ভেবে প্রধান প্রহরী ভয়ে ভয়ে রাজামহাশয়কে জানালেন তার সাথে দেখা করবেন চাচ্ছু ঘটক। কারন জানতে চাইলেই রাজকন্যার জন্য বর পাওয়া গেছে সেই সু-সংবাদ শুনে চাচ্চু ঘটককে সাথে সাথে দরবারের অতিথি শালায় নিয়ে যেতে আদেশ দিলেন।
রাজামহাশয় তাকে হবু বরের আদ্যপান্ত জানতে শুরু করলেন। চাচ্চু ঘটক তার সর্বশেষ কারিশমা দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন মহারাজের মন খুশি করার জন্য। অন্যথায় ভাগ্য গণকের মতো এলাকা ছাড়তে হবে এই ভয়ও আছে তার মনে। চাচ্চু ঘটকের কথা শুনে-মহারাজা খুশি খুব খুশি। এতোদিন যতো বিয়ের পাত্র এসেছে তাদের মধ্যে অন্যতম এই হবু বর।
কেননা-মহারাজার মেয়ের জামাই এমন হওয়া চাই। এমন গুরুত্বপুর্ন দায়িত্ব কে পায়। যিনি চৌ-রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে পোশাকে স্বজ্জিত হয়ে বাঁশিফুকে বাজিয়ে হাত ইশারা দিলেই রাজা-মহারাজা মন্ত্রী সবার গাড়ী পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যাবে। আবার বাঁশি দিলে হাতে ইশারা করলে গাড়ি চলাচর শুরু করবে। আর কি চাই। তার কথায় রাজ্য তাহলে অনায়াসে চলবে। সাবাস সাবাস চাচ্ছু ঘটক। এমন পাত্রই আমি চেয়েছিলাম। হবু বরের বাড়ি কোথায়, বর দেখতে শুনতে কেমন,আর্থিক অবস্থা ,অন্য আর কিছু খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি রাজামহাশয়। মহারাজা মহারাণীর খুশির সীমা নেই। সবাইকে আদেশ দিলো তোমরা আনন্দ করো। বাদ্য বাজাও। রাজদরবারের সকলকে জানিয়ে দাও ,রাজ্যের সবখানে খবর পাঠিয়ে দাও, একমাত্র রাজকন্যা হীরেমতির শুভ বিবাহ।
লেখক : অপু বড়ুয়া


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









