শরৎ এলেই বাংলার আকাশে একটা বদল চোখে পড়ে। নীলের মধ্যে সাদা মেঘ ভেসে যায়, নদীর ধারে কাশফুল দোলে, বাতাসে উৎসবের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও বাঁশ কাটা হচ্ছে, কোথাও খড় দিয়ে প্রতিমার কাঠামো বাঁধা হচ্ছে। তারপর একদিন দেখা যায়, মাটির শরীরে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে এক নারীর মুখ। তার চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি—একদিকে মমতা, অন্যদিকে কঠিন সংকল্প। হাতে অস্ত্র, পাশে সিংহ, পায়ের নিচে মহিষাসুর। যেন তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
কিন্তু একটু দূরে দাঁড়িয়ে প্রতিমাটির দিকে তাকালে আরেকটি দৃশ্যও চোখে পড়ে। দেবীর পাশে গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে যেন একটি পরিবার এসে দাঁড়িয়েছে। এই দুই দৃশ্যের মধ্যে কোনটি সত্যি? দেবী কি অসুরবিনাশী মহাশক্তি, নাকি বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসা বাংলার আদরের মেয়ে?
আসলে দুটোই। আর এই দুই পরিচয়ের মাঝখানেই লুকিয়ে আছে দুর্গার মহাগাথার আশ্চর্য গল্প।
অনেক কাল আগে, যখন পৃথিবীকে দেবতা ও অসুরের দ্বন্দ্বে ব্যাখ্যা করা হতো, তখন মহিষাসুর নামে এক অসুর নিজের শক্তিতে এতটাই উদ্ধত হয়ে উঠেছিল যে দেবতারাও তার সামনে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। একে একে পরাজিত হয়ে তারা বুঝলেন, শুধু নিজেদের শক্তি দিয়ে এই বিপদ ঠেকানো সম্ভব নয়। তখন তাদের সম্মিলিত তেজ থেকে জন্ম নিলেন এক দেবী। তার দশ হাতে দশ রকম অস্ত্র, তাঁর বাহন সিংহ, আর তার মধ্যে একত্র হলো বহু শক্তির দীপ্তি।
দেবী মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলেন। সেই যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের সংঘর্ষ ছিল না; ছিল উদ্ধত ক্ষমতার সঙ্গে প্রতিরোধের লড়াই। শেষ পর্যন্ত মহিষাসুর পরাজিত হলো। দেবী পরিচিত হলেন মহিষাসুরমর্দিনী নামে—যিনি মহিষাসুরকে বধ করেছেন।
এই কাহিনি পাওয়া যায় দেবীমাহাত্ম্য নামের প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে। সেখানে দেবী কেবল একজন যোদ্ধা নন। তিনি মহামায়া—যার শক্তিতে মানুষ জগতের মোহে জড়িয়ে পড়ে, আবার যার কৃপায় সেই মোহের আড়ালে সত্যকেও চিনতে পারে। তিনি বিপদের সময় রক্ষাকারী, অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি, আবার সৃষ্টির গভীরে ছড়িয়ে থাকা এক রহস্যময় উপস্থিতি।
কিন্তু বাংলায় দুর্গার আখ্যান বলতে গেলে শুধু যুদ্ধের কথা বললে চলে না। এখানে আরেকটি গল্প আছে। সেই আখ্যানে দেবী যুদ্ধজয়ী মহাশক্তি নন, তিনি উমা—হিমালয় ও মেনকার মেয়ে। বিয়ের পর স্বামী শিবের সঙ্গে তার সংসার কৈলাসে। সে সংসার দেবলোকের হলেও তার মধ্যে সুখ-দুঃখের অভাব নেই। শিব সংসারী মানুষের চেনা নিয়মে চলেন না; তার জীবন ধ্যান, তপস্যা আর বৈরাগ্যে ভরা। আর এদিকে মেয়ের জন্য মায়ের মন পড়ে থাকে। মেনকা ভাবেন, মেয়ে কেমন আছে? কত দিন হলো তাকে দেখেননি!

এইখানেই পুরাণের দেবী বাংলার ঘরের মেয়ের কাছাকাছি চলে আসেন। শরৎকালে উমা বাপের বাড়ি আসবেন—এই কল্পনাকে ঘিরে বাংলার মানুষ ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছে এক গভীর আবেগের জগৎ। আগমনী গানে মায়ের আকুলতা শোনা যায়। মেয়ে আসছে, ঘর ভরে উঠবে, কত দিনের শূন্যতা ঘুচবে। কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে অল্প দিনের সুখের আশঙ্কা। কারণ উমা চিরকাল থাকবেন না। কয়েক দিন পর তাকে আবার ফিরে যেতে হবে স্বামীর ঘরে। বাঙালি তাই দেবীর আগমনে শুধু উৎসব করে না, তাকে নিজের পরিবারের মানুষ বলেও অনুভব করে। মণ্ডপে যে দেবী অসুরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন, তিনিই যেন বাড়ির সেই মেয়ে, যাকে মা স্নেহে কাছে টেনে নেন, যার জন্য বাবা অপেক্ষা করে থাকেন, যার বিদায়ে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আসে।
এই দুই আখ্যানের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। তবে এদের উৎস এক নয়। দেবীমাহাত্ম্য মূলত দেবীর অসুরবিনাশী শক্তি ও মহিমার আখ্যান। অন্যদিকে সতী ও পার্বতীর কাহিনি শিবকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন পুরাণের অংশ। আর উমার আগমন, মেনকার আকুলতা, বিজয়ার বিদায়—এসবের আবেগ বাংলার নিজস্ব সাহিত্য, গান, লোকবিশ্বাস ও পূজার ঐতিহ্যে দীর্ঘকাল ধরে রূপ পেয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলাদা আলাদা আখ্যান এসে মিলেছে মানুষের কল্পনায়। দেবী হয়ে উঠেছেন একই সঙ্গে মহাজাগতিক শক্তি ও ঘরের মেয়ে।
এই মিলনের মধ্যে একটা গভীর মানবিক সত্য আছে। মানুষ তার সবচেয়ে বড় শক্তিকেও আপন করে নিতে চায়। দূরের দেবীকে কাছে আনার জন্যই হয়তো তাঁকে পরিবারের একজন করে কল্পনা করেছে বাংলা। যিনি দুষ্টের দমন করেন, তাকেই আবার মায়ের কোলে ফিরে আসা মেয়ের রূপে দেখা হয়েছে। তার দশ হাতে অস্ত্র আছে, অথচ তার আগমনে ঘরের মেয়েরা নিজেদের আনন্দ, অভিমান ও বিচ্ছেদের স্মৃতিও খুঁজে পায়।
প্রতিমার দিকে তাকালে তাই একই সঙ্গে দুটো পৃথিবী দেখা যায়। একদিকে মহিষাসুরের সঙ্গে দেবীর যুদ্ধ, অন্যদিকে মেয়ের বাড়ি ফেরার আনন্দ। একদিকে দেবতাদের পরাজয় ও পুনরুত্থানের মহাকাব্য, অন্যদিকে মায়ের অপেক্ষা আর বিদায়ের দীর্ঘশ্বাস। দুর্গার এই দুই রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শক্তি মানেই শুধু যুদ্ধ নয়; শক্তি মানে ভালোবাসাকে রক্ষা করা, অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানো, আবার প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করার ক্ষমতাও। মহিষাসুরকে বধ করার কাহিনি বহু প্রাচীন। কিন্তু তার অর্থ আজও ফুরিয়ে যায়নি। মহিষাসুরকে কেবল একটি পুরাণের অসুর হিসেবে দেখলে গল্পটির গভীরতা ধরা পড়ে না। সে অহংকারের প্রতীক হতে পারে, এমন ক্ষমতার প্রতীক হতে পারে, যা নিজের শক্তিকে সবার ওপরে মনে করে। যে শক্তি অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়, দুর্বলকে অপমান করে, নিজের ইচ্ছাকেই নিয়ম বলে চালাতে চায়—তার সামনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন কখনো শেষ হয় না।
দেবীর আখ্যান শুধু শত্রুকে পরাজিত করার গল্পও নয়। যুদ্ধের পর পৃথিবীতে কী ফিরে আসে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ আবার নিরাপদে বাঁচতে পারে কি না, ভয় কাটিয়ে উঠতে পারে কি না, নিজের মর্যাদা ফিরে পায় কি না—সেই প্রশ্নও এই কাহিনির মধ্যে রয়েছে। শক্তির সার্থকতা তাই ধ্বংসে নয়, মানুষের জীবনকে রক্ষা করার মধ্যে।
শরতের পূজামণ্ডপে কিশোর-কিশোরীরা যখন দেবীর সামনে দাঁড়ায়, তখন হয়তো তারা এসব কথা ভেবে আসে না। তারা দেখে আলো, সাজসজ্জা, ঢাকের শব্দ, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরার আনন্দ। আবার কেউ দেবীর চোখের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়, কেউ মহিষাসুরের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে যুদ্ধের কথা, কেউ পরিবারের সঙ্গে পূজার স্মৃতি মনে করে। কিন্তু উৎসবের এই বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তারা একটি পুরোনো গল্পের অংশ হয়ে ওঠে। প্রতি বছর মৃৎশিল্পী মাটি দিয়ে দেবীর শরীর গড়েন, শিল্পী তার চোখ আঁকেন, মানুষ তাকে ঘিরে মণ্ডপ সাজায়। তারপর পূজা শেষে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। দেবী চলে যান। পড়ে থাকে শূন্য মণ্ডপ, কিছু ফুল, ধূপের গন্ধ, আর ফিরে যাওয়ার বিষণ্নতা। কিন্তু পরের শরতে আবার তকে গড়ে তোলা হবে। আবার তিনি আসবেন—কখনো মহিষাসুরমর্দিনী হয়ে, কখনো উমা হয়ে, কখনো বাংলার ঘরের মেয়ে হয়ে। হয়তো এই ফিরে আসার মধ্যেই দুর্গার মহাগাথার সবচেয়ে বড় রহস্য। দেবী একবার অসুরকে বধ করেছিলেন বলে তার গল্প বেঁচে নেই শুধু; তিনি বারবার মানুষের কল্পনায় ফিরে আসেন বলে গল্পটি নতুন অর্থ পায়। কখনো তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, কখনো বিপদের মধ্যে আশ্রয়, কখনো দূরে চলে যাওয়া মেয়ের জন্য মায়ের অপেক্ষা।
তাই দুর্গাপূজা শুধু দেবীর বিজয় উদ্যাপন নয়। এটি শক্তির সঙ্গে স্নেহের, মহাকাব্যের সঙ্গে ঘরোয়া জীবনের, পুরাণের সঙ্গে মানুষের স্মৃতির মিলন। দেবী যখন মণ্ডপে দাঁড়ান, তার হাতে অস্ত্র ঝলসে ওঠে; আর তার মুখে ফুটে থাকে এমন এক পরিচিত কোমলতা, যা দেখে মনে হয়—অনেক দূর থেকে তিনি আবার নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছেন।
সেই বাড়ির নাম বাংলা। আর সেই ফিরে আসার গল্পই—মহিষাসুরমর্দিনী থেকে বাংলার ঘরের মেয়ে হয়ে ওঠার আখ্যান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









