তারকা হওয়া এক জিনিস, আর তারকাখ্যাতির ঝুঁকি নিয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো আরেক জিনিস। হলিউড, পপসংগীত কিংবা রকের জগতে এমন শিল্পীর সংখ্যা খুব বেশি নয়, যাঁরা জনপ্রিয়তা হারানোর আশঙ্কা জেনেও নিজের অবস্থান বদলান না। ব্রুস স্প্রিংস্টিন সেই বিরল শিল্পীদের একজন। ৭৬ বছর বয়সেও তিনি শুধু গিটার বাজাচ্ছেন না, গানকে ব্যবহার করছেন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরব হয়ে তিনি আবারও মনে করিয়ে দিলেন—সংগীত কেবল বিনোদন নয়, সমাজ বদলেরও শক্তিশালী হাতিয়ার।
১৯৬৭ সালে মারা যান মার্কিন লোকসংগীতের কিংবদন্তি উডি গাথরি। মৃত্যুর পর তার বন্ধু ও সংগীতশিল্পী পিট সিগার বলেছিলেন, ‘মানুষ যত দিন উডির গান গাইবে, তত দিন তিনি বেঁচে থাকবেন।’ প্রায় ছয় দশক পর সেই কথাই যেন নতুন করে সত্যি করে তুলছেন ব্রুস স্প্রিংস্টিন।
সম্প্রতি শেষ হওয়া তার ‘ল্যান্ড অব হোপ অ্যান্ড ড্রিমস আমেরিকান ট্যুর’–এর প্রতিটি কনসার্ট শেষ হয়েছে গাথরির বিখ্যাত গান ‘দিস ল্যান্ড ইজ ইয়োর ল্যান্ড’ দিয়ে। এটা শুধু একটি গান নয়, আমেরিকার প্রতিবাদী সংস্কৃতির অন্যতম বড় প্রতীক।
উডি গাথরির গিটারে লেখা ছিল বিখ্যাত সেই বাক্য—‘This Machine Kills Fascists।’ অবশ্য সেটি অস্ত্রের সহিংসতার ডাক ছিল না; বরং সংগীত ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ, বর্ণবাদ ও ঘৃণার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা।
আজ স্প্রিংস্টিনের হাতে সেই গিটার নেই, কিন্তু তার গানের বার্তা যেন একই। নিজের ফেন্ডার টেলিকাস্টার হাতে নিয়ে তিনি এখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব।
এবারের সফরের শুরু থেকেই স্প্রিংস্টিন জানিয়ে দিয়েছিলেন, এটি হবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সফর। তার ভাষায়, এই ট্যুর উৎসর্গ করা হয়েছে মার্কিন গণতন্ত্র, সংবিধান এবং সেই সব মূল্যবোধের প্রতি, যেগুলো আজ আক্রমণের মুখে।
স্প্রিংস্টিনের এই অবস্থান নতুন নয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর তিনি শোকাহত আমেরিকানদের জন্য আশার গান গেয়েছিলেন। তবে সেটি ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময়।
রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নেন ২০০৪ সালে। ‘ভোট ফর চেঞ্জ’ সফরের মাধ্যমে প্রকাশ্যে জর্জ ডব্লিউ বুশের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামেন। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধেরও সমালোচনা করেন। এরপর থেকে পুলিশি নির্যাতন, ওয়াল স্ট্রিটের করপোরেট লোভ কিংবা রিপাবলিকানদের নানা নীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর প্রতিবাদী গান ‘স্ট্রিটস অব মিনিয়াপোলিস’–এ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংস্থা আইস (ICE)-এর কঠোর সমালোচনা করেন। এমনকি সংস্থাটিকে তিনি আখ্যা দেন ‘ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বাহিনী’ হিসেবে।
এই গান তিনি উৎসর্গ করেন মিনিয়াপোলিসের মানুষ, নিরপরাধ অভিবাসী এবং আইস অভিযানে নিহত দুই ব্যক্তির স্মৃতির প্রতি। শুধু গানেই নয়, অভিবাসীদের পক্ষে আয়োজিত বিক্ষোভেও অংশ নিয়েছেন তিনি। এমনকি টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও এই গান গেয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
অনেকেই মনে করেন, ট্রাম্প ঐতিহাসিক অর্থে ফ্যাসিস্ট নন। কিন্তু স্প্রিংস্টিনের আপত্তি তার রাজনীতির ধরন ও ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে। লেখক সিরি হুস্টভেডের ভাষায়, ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠরা এমন এক আমেরিকা গড়তে চান, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে।
মজার বিষয় হলো, স্প্রিংস্টিন নিজে ধনী, শ্বেতাঙ্গ, পুরুষ এবং ধর্মবিশ্বাসী। অর্থাৎ তিনি সেই সব মানুষের দলে নন, যাঁরা সরাসরি বৈষম্যের শিকার। তবু তিনি প্রতিবাদ করছেন, কারণ তার কাছে বিবেক জনপ্রিয়তার চেয়ে বড়।
এই জায়গাতেই স্প্রিংস্টিন আলাদা। তিনি চাইলে কোটিপতি সুপারস্টারের আরামদায়ক জীবন কাটাতে পারতেন। পুরোনো হিট গান গেয়ে স্টেডিয়াম ভরিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই পথ বেছে নেননি।
অবশ্য এর মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে। অনেক ভক্ত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, এসেছে প্রাণনাশের হুমকিও। তবু তিনি থামেননি।
সম্ভবত এখানেই একজন শিল্পীর প্রকৃত পরীক্ষা। হারানোর কিছু না থাকলে সাহস দেখানো সহজ। কিন্তু খ্যাতি, অর্থ, কোটি ভক্ত—সবকিছু ঝুঁকির মুখে রেখেও নিজের বিশ্বাসে অটল থাকা অনেক কঠিন।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, অন্ধকার সময়ে নীরবতা কোনো সমাধান নয়। ব্রুস স্প্রিংস্টিন সেই ইতিহাসই যেন আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন। তার গিটার থেকে বের হওয়া সুর আজও শুধু বিনোদন দেয় না, মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়। আর সম্ভবত সেখানেই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









