ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের পর এবার ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল নতুন করে মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া আগুনে ইতোমধ্যে ৩ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, বিপন্ন হয়েছে জনপদ, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য। পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ও খরাই এ ধরনের বিধ্বংসী দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরোন্দ অঞ্চলে দাবানলের ভয়াবহতা অব্যাহত রয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু শনিবার রাতেই আরও ৫৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে অঞ্চলটিতে মোট প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সে সংঘটিত সবচেয়ে বড় দাবানলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত এই আগুনে জিরোন্দ অঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর (১ লাখ ৩ হাজার ৭৮০ একর) ভূমি পুড়ে গেছে।
আগুন ধীরে ধীরে দেশটির বিখ্যাত মদ উৎপাদনকারী বন্দরনগরী বোর্দোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শহরটির মেয়র থমাস কাজেনাভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে জানান, ‘বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা নেই—এমন সব বাস্তুচ্যুত মানুষকে সর্বোত্তমভাবে আশ্রয় দেওয়ার জন্য শহরটি প্রস্তুত রয়েছে।’
ইউরোপজুড়ে চলমান এই দাবানল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ডাবলিওএমও জানিয়েছে, গত জুন মাস পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুন ছিল এবং বিশ্বব্যাপী এটি ছিল দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন। একই সময়ে জার্মানি ও যুক্তরাজ্য টানা তিন দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড গড়ে।
ফ্রান্স ও স্পেনের অগ্নিনির্বাপণ বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রাণপণ চেষ্টা চালালেও অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও সরঞ্জামের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দাবানলের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ফ্রান্স সরকার ১,৫০০ সেনাসদস্য, ১,৭০০ নিরাপত্তাকর্মী এবং ১,৪০০ অগ্নিনির্বাপক কর্মী মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি আগুন নেভাতে আকাশপথে অগ্নিনির্বাপক রাসায়নিক ছিটাতে সামরিক বিমানও ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ফ্রান্সকে সহায়তার জন্য পাঁচটি বিমান ও দুটি হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী স্পেনে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চল এবং পূর্ব উপকূলীয় ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলের দাবানলের কারণে ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শনিবার অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা একটি গাড়ির ভেতর থেকে এক বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করেন।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, চলতি বছর দেশটিতে ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর ভূমি দাবানলে পুড়ে গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমাদের সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









